
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় গুলিতে নিহত রাকিব হত্যা মামলার চার্জশিট ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দাখিল করা এ চার্জশিটে একদিকে মৃত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে, অন্যদিকে প্রভাবশালী জীবিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৩৫ জন নেতাকে রহস্যজনকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
মৃতদের নাম চার্জশিটে—তদন্তে চরম গাফিলতি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চার্জশিটে এমন তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে যারা ঘটনার অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন।
তারা হলেন—ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম সাইফুল্লাহ বাদল (মৃত্যু: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫), কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা রোকন উদ্দিন (মৃত্যু: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫) এবং ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজ উদ্দিন বাবু (মৃত্যু: ৫ মার্চ ২০২৬)।
একটি হত্যা মামলার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন অদক্ষতা শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং এটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও মনে করছেন সচেতন মহল।
প্রভাবশালী নেতাদের ‘রহস্যময়’ অব্যাহতি
অন্যদিকে, আন্দোলনের সময় মাঠে সক্রিয় ও এলাকায় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত একাধিক নেতা চার্জশিট থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন সোনারগাঁ থানা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুজ্জামান মাসুদ, কুতুবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর মেম্বার, ফতুল্লা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু মোহাম্মদ শরীফুল হক, জেলা ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রাব্বি প্রান্ত, কুতুবপুরের আল মামুন ভূঁইয়া মিন্টুসহ আরও অনেকে।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি—“অপরাধ প্রমাণ না হওয়া” এবং “ঠিকানা সঠিক না পাওয়া”র কারণেই তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে এমন ব্যাখ্যা জনমনে আরও প্রশ্ন উসকে দিয়েছে—প্রভাবশালীদের বাঁচাতেই কি এই কৌশল?
ঘটনার পটভূমি
২০২৪ সালের ২০ জুলাই, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের চাষাড়া এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন দাপা এলাকার রাকিব।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা মোশারফ হোসেন বাদী হয়ে ২৫ আগস্ট ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১৯৪ জনকে আসামি করা হয়।
পরবর্তীতে চলতি বছরের মার্চে সিআইডি ১৬৬ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করে—যা এখন তীব্র সমালোচনার মুখে।
সিআইডির বক্তব্যে অসংগতি
চার্জশিটে মৃতদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর জয়নাল আবেদীন বলেন, “তদন্ত চলাকালে তারা মারা গেছেন—এ তথ্য আমাদের জানানো হয়নি।”
এ বক্তব্যকে দায়িত্ব এড়ানোর অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন অনেকেই। কারণ, একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অভিযুক্তদের মৌলিক তথ্য যাচাই করা তদন্ত সংস্থার প্রাথমিক দায়িত্ব।
জনমনে ক্ষোভ ও প্রশ্ন
এ ঘটনায় নিহতের পরিবারসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মৃত ব্যক্তিদের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন—
সিআইডি কি আদৌ নিরপেক্ষ তদন্ত করেছে, নাকি কোনো প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে এই বিতর্কিত চার্জশিট তৈরি করা হয়েছে ?
উপসংহার
রাকিব হত্যা মামলার চার্জশিট শুধু একটি তদন্ত প্রতিবেদনের সীমায় নেই; এটি এখন বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
মৃতদের আসামি করা এবং জীবিত প্রভাবশালীদের অব্যাহতি দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে, ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও ভেঙে পড়বে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।