
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জে এক সময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও তার দীর্ঘদিনের সরকারি ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হাফিজুর রহমান মান্না এখন রহস্যময়ভাবে আড়ালে।
নানা অভিযোগে আলোচনায় থাকা এই ব্যক্তিকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—কোথায় এখন মান্না ?
স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক মহলের দাবি, শামীম ওসমানের ক্ষমতার ছায়ায় থেকেই মান্না নারায়ণগঞ্জে একপ্রকার ‘ছায়া শাসক’ হিসেবে গড়ে ওঠেন।
প্রশাসনের বদলি-বাণিজ্য, সরকারি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি বিএনপি ঘরানার কিশোরগঞ্জের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান ইকবালের সঙ্গে মান্নাকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এমনকি তাকে ইকবালের সরকারি পিএস হিসেবেও কাজ করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংসদ ভবনেও তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
রাজনৈতিক মহলে আরও আলোচনা রয়েছে, শামীম ওসমান ও ইকবালের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ও পরে তাদের নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়ায়।
৮ জুন (রোববার) সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের বিরুদ্ধে মামলার সময়ও ইকবালের পাশে মান্নাকে দেখা গেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
মান্নার অতীত কার্যক্রম ঘিরেও রয়েছে বিতর্ক।
২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জের একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক আবু সাউদ মাসুদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করে সমালোচনার জন্ম দেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতেই এই মামলা করা হয়েছিল।
২০০৯ সালে সরকারি পিএস হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রায় দেড় দশক ধরে শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মান্না।
এই সময়ে তিনি সরকারি সকল টেন্ডারবাজি, সুযোগ-সুবিধা ভোগের পাশাপাশি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক ও জনপথ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার কমিশন আদায় করা হয়েছে।
এমনকি প্রতিটি টেন্ডারে নির্দিষ্ট হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শামীম ওসমান পলাতক থাকা অবস্থায় এখনো গণপূর্তির টেন্ডার নিয়ে লুটপাটের কর্মযজ্ঞ চালাতে বিদেশে বসেই মান্না ও ইকবালের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে অত্যন্ত গোপনে নানান লুটপাটের ছক তৈরি করে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রাজনৈতিক নেতা অভিযোগ করেন, “শামীম ওসমানের ছত্রছায়ায় থেকে মান্না কার্যত নারায়ণগঞ্জে দ্বিতীয় গডফাদারে পরিণত হয়েছিল।”
এছাড়া প্রশাসনিক বদলি বাণিজ্য, বিশেষ করে থানার ওসি পদে বদলি নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
গণমাধ্যমকর্মীদের একটি অংশও এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাসিন্দা মান্না নিজ এলাকায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদ দখল করে সেখানেও অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শামীম ওসমান ও তার ঘনিষ্ঠরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পর থেকেই মান্নার অবস্থান নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী এখন তার গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছেন।
তাদের মতে, “মান্নাকে আইনের আওতায় আনতে পারলেই নারায়ণগঞ্জের বহু অন্ধকার অধ্যায়ের তথ্য বেরিয়ে আসবে।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাফিজুর রহমান মান্নার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি।