
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
রাত গভীর হলে আকাশে উড়ানো হয় ড্রোন। দিনের আলোয় সড়কের মোড়ে লাগানো গোপন সিসি ক্যামেরায় নজরদারি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে নিজ এলাকায় এভাবেই প্রযুক্তির ব্যবহার করেন মাদক কারবারি সাব্বির। অভিনব কায়দার মাদকের এ নিয়ন্ত্রক তার অপরাধী গ্রুপের মধ্যে ‘চশমা সাব্বির’ বলে অধিক পরিচিত।
ত্রিশোর্ধ্ব এই যুবক নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকার বাসিন্দা। হত্যা, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ অসংখ্য মাদক মামলার আসামি সাব্বিরকে স্থানীয়রাও চেনেন ‘চশমা সাব্বির’ নামে। বিসিক শিল্পনগরী ঘেঁষা শ্রমিক অধ্যুষিত মাসদাইর গুদারাঘাট, হাজীরমাঠ ও মিস্ত্রী বাগ এলাকায় এখন এক আতঙ্কের নাম এই ‘চশমা সাব্বির’ ও তার সহযোগীরা।
গত ২৩ মে রাতে মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকায় এক পোশাক ব্যবসায়ীর কাছে দাবি করা ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে তার ব্যক্তিগত গাড়ির চালককে কুপিয়ে আহত করে সাব্বিরের বাহিনী। এ ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। পরবর্তীতে সাব্বিরের বাড়িতে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় তাকে না পাওয়া গেলেও, বাসা থেকে দেশীয় অস্ত্র, হাতবোমা, ড্রোন, সিসি ক্যামেরা, ৩ হাজার পিস ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার করে পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা প্রেস নারায়ণগঞ্জকে বলেন, সাব্বির তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তবে তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালানো হলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। উল্টো নিজ এলাকায় সিসি ক্যামেরা ও ড্রোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই পর্যবেক্ষণ করেছেন বলে তথ্য দেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহত্তর মাসদাইরে এখন তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপ মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখানে মাদক সরবরাহ থেকে শুরু করে বিক্রি সবই হয় তাদের মাধ্যমে। এই তিন বাহিনীর প্রধান- জাহিদ, সেলিম ওরফে কসাই সেলিম ও সাব্বির এলাকাভিত্তিক ভাগ হয়ে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করেন।
মাসদাইরের ফারিয়া গার্মেন্টসের মোড়, গাইবান্ধা বাজার, ঘোষেরবাগ, লিচুবাগ ও গলাচিপার কিছু অংশে মাদক বিক্রি করেন জাহিদ। মাসদাইর বাজার, বেগম রোকেয়া স্কুলের মোড় ও ছোট কবরস্থান এলাকায় মাদকের বড় ডিলার কসাই সেলিম। এদিকে, সাব্বির ওরেফ চশমা সাব্বিরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে গুদারাঘাট, হাজীর মাঠ ও মিস্ত্রীবাগ এলাকা।
মাসদাইর গুদারাঘাট এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই পোলা (সাব্বির) খুবই ভয়ঙ্কর। ওর সাথে কসাই নাসির, চক্ষু হৃদয় এবং আরো ভয়ঙ্কর অপরাধীরা চলে। এই গ্রুপ শুধু মাদক না, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ফিটিংবাজি; সব করে। সরকার তো খালি বড়লোকদের (ধনী) অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়। এমনে সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসা চলতে থাকলে, সন্ত্রাসীদের ঠেকাইতে ভবিষ্যতে আমাদেরও অস্ত্র রাখতে হইব।”
মাদক কারবারিদের অভ্যন্তরীণ মারামারিতে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাসদাইরের ঘোষেরবাগ এলাকায় ইমন নামে এক যুবক খুন হয়। পুলিশের সহযোগী হিসেবে কাজ করায় তাকে মেরে ফেলার অভিযোগ উঠে সাব্বিরের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালে মাসদাইর বাজার এলাকায় পুলিশ সদস্যদের উপর হামলার ঘটনায় সাব্বিরসহ দেড়শ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। এর আগে ২০২২ সালেও পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় সাব্বিরকে আসামী করা হয়। সবশেষ গত মাসে এক পোশাক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে তার গাড়ির ড্রাইভারকে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠে সাব্বিরের বিরুদ্ধে।
যদিও স্থানীয়দের দাবি, সাব্বির হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির আরো অনেক ঘটনায় জড়িত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠা সাব্বিরের মতো মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের দাবিও জানান তারা।
নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অপরাধ তারেক আল মেহেদী বলেন, “সাব্বিরকে ধরতে কিছুদিন আগে আমরা মাসদাইরে অভিযানে গিয়েছিলাম। এ সময় ওর বাসা থেকে বিপুল পরিমান মাদক উদ্ধার করেছি, চকলেট বোমা পেয়েছি এবং ড্রোন পেয়েছি। ড্রোন দিয়ে সে আমাদের নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করে। পুলিশ বা র্যাব কখন চলে আসলো সকল খবর ওরা রাখে। আমরা চেষ্টা করছি ওদের ধরতে। আশা করি এই অপরাধীদের দ্রুতই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।”