
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটছিলেন যুবক। চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল আগে আলট্রাসনোগ্রাম করাতে হবে। কিন্তু আলট্রাসনোগ্রাম না করিয়েই তাকে ভয় দেখিয়ে বলা হয়- এখনই সিজার না করলে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। আতঙ্কিত হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি সম্মতি দেন। এরপর তড়িঘড়ি অপারেশন, নবজাতকের শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেন সংকট এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধার অভাব- সবমিলিয়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে।
এ ঘটনায় ফতুল্লার কাশীপুর এলাকার বাসিন্দা মো. রায়হান বেপারী সজিব সিভিল সার্জন বরাবর অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল সকালে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট খানপুর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে জরুরি আলট্রাসনোগ্রামের পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে যান পাশেই অবস্থিত মেডিস্টার হাসপাতাল ও রেনেসাঁ ল্যাবে। সেখানে দায়িত্বরত এক নার্স তার স্ত্রীর অবস্থা গুরুতর বলে দাবি করে দ্রুত সিজারের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। তবে কোনো চিকিৎসক সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলেননি এবং আলট্রাসনোগ্রাম ছাড়াই অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেই অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, অপারেশনের পর একটি পুত্র সন্তান জন্ম নিলেও নবজাতকের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত হয়নি। শিশুটির প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়, কিন্তু সেই অক্সিজেনও নিয়মিত সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। একাধিকবার অদক্ষ নার্স ক্যানোলা দিতে গিয়ে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানান, নবজাতকের একটি ফুসফুস আংশিকভাবে কাজ করছিল না এবং তার নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন ছিল।
ভুক্তভোগী রায়হান বেপারী সজিব বলেন, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালটির ব্যবস্থাপক নিজেই পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন তাদের প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ এবং এনআইসিইউ সুবিধা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে আমার প্রিম্যাচিউর শিশুর ক্ষেত্রে সিজার করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। তাছাড়া প্রয়োজনীয় আলট্রাসনোগ্রাম না করিয়ে খরচ বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেও আমি জানতে পেরেছি।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল থেকে দেওয়া ডিসচার্জ সনদে গর্ভকাল সংক্রান্ত যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা পূর্ববর্তী রিপোর্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যা স্পষ্টভাবে বিভ্রান্তিকর। এসব ঘটনার মাধ্যমে আমি মনে করি, আমার সঙ্গে চিকিৎসায় গুরুতর অবহেলা এবং প্রতারণা করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে আমি বিষয়টি যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছি। কিন্তু সিভিল সার্জন উল্টো আমাকেই দোষারোপ করলো- আমি কেন নার্সের কথায় সিজার করতে বললাম। এরপর আমি এই অভিযোগের বিষয়ে কথা বলিনি।
সিদ্ধিরগঞ্জের পূর্ব কলাবাগ চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার বাসিন্দা কাউছার মাহমুদ অভিযোগ করে বলেন, গত বছর তার স্ত্রী মাকসুদা আক্তার অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এস আলম ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে কর্মরত গাইনি চিকিৎসক ডা. শারমিন নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। কিন্তু হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১০ জানুয়ারি তাকে খানপুরের আল হেরা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তিনি মৃত সন্তান প্রসব করেন।
পরিবারের দাবি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুলভাবে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়েছিল এবং নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও তা সঠিকভাবে শনাক্ত করা হয়নি।
কাউছার মাহমুদ বলেন, রিপোর্ট ভুল ছিল বলেই আমরা বুঝতে পারিনি সন্তানের অবস্থা খারাপ। পরে অন্য হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারি, বাচ্চা আগেই মারা গেছে।
তবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শহিদুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ আনা হয়েছিলো।
একই বছর চাষাড়া বালুরমাঠ এলাকায় অবস্থিত হেলথ রিসোর্ট হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় ডেঙ্গু আক্রান্ত এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে। স্বজনদের দাবি, কয়েকদিন জ্বরে ভোগার পর পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক একটি ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই তার অবস্থার অবনতি ঘটে। শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দ্রুত ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়।
পরিবারের অভিযোগ, রোগীর শারীরিক অবস্থা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করে জানান, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
চাষাড়ার আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিলভার ক্রিসেন্ট হসপিটালে টনসিল অপারেশনের সময় ভুল চিকিৎসায় মেহেনাজ আক্তার আনিকা নামে এক নারীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
নিহতের বাবা আমানত উল্লাহ জানান, টনসিল অপারেশনের জন্য প্রায় ৮০ হাজার টাকায় চুক্তি করা হয়। অপারেশনের পর রাতে ব্যথা বাড়লে একাধিকবার ইনজেকশন দেওয়া হয়, কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরদিন সকালে তার মেয়ের হাত-পা নীল হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মারা যান।
পরিবারের অভিযোগ, অপারেশনের পর চিকিৎসক রোগীর খোঁজ নেননি এবং ভুল চিকিৎসার কারণেই মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ এসে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসকসহ কয়েকজনকে আটকও করে।
এ ছাড়াও শহরের একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও ভুল চিকিৎসার অভিযোগে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা তোলপাড় সৃষ্টি করে। শিশুটির মা আরবি আমান রিয়া জানান, তার শিশু সন্তানকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসক উজ্জ্বল মিত্রের কাছে নেওয়া হলে নিউমোনিয়া শনাক্ত করে একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। সেই ইনজেকশন দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটির শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। পরে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের দাবি- সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না করে উচ্চমাত্রার ইনজেকশন দেওয়ার কারণেই এই মৃত্যু হয়েছে।
নানা অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযানে নামে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন। গত ১ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ছয় দিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত মোবাইল কোর্টে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে মোট ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অভিযানে উঠে এসেছে লাইসেন্স না থাকা বা হালনাগাদ না করা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা প্রদান, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অদক্ষ জনবল দিয়ে সেবা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবের মতো গুরুতর অভিযোগ।
৬ এপ্রিল পরিচালিত এক অভিযানে মেডিস্টার হাসপাতাল ও রেনেসাঁ ল্যাবেও একাধিক অনিয়ম পাওয়া যায়। সেবার মূল্য তালিকা সংরক্ষণে অসঙ্গতি, অপারেশন থিয়েটারে স্বাস্থ্যবিধি না মানা, স্টেরিলাইজেশন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবের মতো অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয়।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের ব্যস্ততম এলাকা চাষাড়ার বঙ্গবন্ধু রোড ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোড ঘিরে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যেই গড়ে উঠেছে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ৩০টি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রধান সড়কের দুই পাশ ছাড়াও আশপাশের অলিগলিতেও চোখে পড়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের ছড়াছড়ি। একই চিত্র দেখা যায় পুরো নারায়ণগঞ্জ সদরজুড়েই। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু সদর উপজেলাতেই বর্তমানে ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২টিতে।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলায় বর্তমানে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের সংখ্যা ১৪৯টি, প্যাথলজি ইউনিট রয়েছে ৭০টি, ব্লাড ব্যাংক ৯টি এবং ডায়ালাইসিস সেন্টার ২টি। সংখ্যার দিক থেকে এটি একটি বড় পরিসর হলেও সেবার মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
স্বাস্থ্যখাতের এসব অনিয়ম নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মুশিউর রহমান বলেন, নারায়ণগঞ্জে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সবাই মানদণ্ড মেনে চলছে— এটা বলা যাবে না। অনেক প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিলেও তা হালনাগাদ করে না, আবার কেউ কেউ সীমিত সুবিধা নিয়েই পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের মতো সেবা দিচ্ছে। আমরা নিয়মিত তালিকা হালনাগাদ করছি এবং যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, রোগীর জীবন নিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। লাইসেন্স, জনবল, যন্ত্রপাতি— সবকিছু যাচাই করেই প্রতিষ্ঠান চালাতে হবে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চলমান আছে এবং ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে। শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠান বন্ধও করা হবে।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, এই খাতটি এখন পুরোপুরি বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। খুব সহজেই একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টার খোলা যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত ডাক্তার, টেকনিশিয়ান বা যন্ত্রপাতি আছে কি না— সেটা কেউ যাচাই করছে না। তদারকি দুর্বল হওয়ায় অনিয়মকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এর ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
তবে এসব অনিয়মের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি নারায়ণগঞ্জ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক সমিতির সভাপতি ডা. মুজিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ডা. ফারুক আহমেদ।