
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের শিল্প ও রাজনীতির অলিগলিতে মোহাম্মদ হাতেম নামটি নতুন নয়। তবে প্রশ্ন হলো—তিনি আদৌ একজন নিরপেক্ষ শিল্প উদ্যোক্তা, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার দরবার বদলে নেওয়া এক চেনা সুবিধাবাদী চরিত্র ?
বিকেএমইএর সভাপতি হিসেবে নিজেকে শিল্প খাতের মুখপাত্র দাবি করলেও, বাস্তবতা বলছে—মোহাম্মদ হাতেম বরাবরই ক্ষমতার নিকটবর্তী থাকতে মরিয়া। সরকার বদলায়, রাজনৈতিক মেরুকরণ বদলায়, কিন্তু হাতেমের অবস্থান বদলায় না—শুধু মুখ ঘোরে নতুন ক্ষমতার দিকে। তেলবাজি করে স্বর্থ হাসিল ই তার মূল লক্ষ্য।
শেখ হাসিনার পতনের আগের দিন: কাদের পক্ষে ছিলেন হাতেম ?
২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের একদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠকে মোহাম্মদ হাতেমের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওই বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাপ কমাতে ব্যবসায়ীদের ‘সব ধরনের সহযোগিতার’ আশ্বাস দেওয়া হয়—এমন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে / রয়েছে।
শেখ হাসিনা পতনের পর পর নিজেকে রক্ষা করতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলমের হাতে ৫০ লা্খ টাকা হস্তান্তর করে সেই যাত্রায় রক্ষা পান এই হাতেমসহ ওসমানীয় চক্রের দালাল সদস্যরা।
প্রশ্ন উঠেছে—
নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ‘ওসমানপন্থী অন্যতম দালাল’ হিসেবে পরিচিত—এমন অভিযোগ স্থানীয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের মুখে মুখে। এই পরিচয়ের কারণেই একাধিকবার প্রকাশ্যে অপমান, ধিক্কার ও লাঞ্ছনার মুখে পড়েন সভাস্থ থেকেও বিতারিত হয়েছেন তিনি। কিন্তু তাতেও তার রাজনৈতিক দৌড়ঝাঁপ থেমে থাকেনি হাতেমের ।
এতো অপমানের পরও দৌড় : কেন এত মরিয়া ?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক অপমান বা সামাজিক প্রত্যাখ্যানের পরও হাতেমের লক্ষ্য একটাই—ক্ষমতার বলয়ে থাকা। নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী মহলের একাংশ বলছে,“তিনি শিল্প সংগঠনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রভাব আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান।”
এই অভিযোগ নতুন নয়। বরং বছরের পর বছর ধরে একই অভিযোগ ঘুরেফিরে এসেছে—
ক্ষমতার সঙ্গে থাকা, সুবিধা নেওয়া, প্রয়োজনে অবস্থান বদলানো।
তারেক রহমানের পাশে বসা : নিছক সৌজন্য, না নতুন বার্তা ?
এমন প্রেক্ষাপটে রাজধানীর গুলশানে আজ রোববার (৪ জানুয়ারি) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের বৈঠকে মোহাম্মদ হাতেমের উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিস্ফোরক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
তারেক রহমানের পাশে বসে করমর্দনের দৃশ্যকে অনেকেই দেখছেন ইমেজ পুনর্গঠনের নাটকীয় প্রচেষ্টা হিসেবে।
নারায়ণগঞ্জজুড়ে গুঞ্জন—
তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ‘পদলেহন’ করছেন, ভবিষ্যতের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে।
প্রশ্ন উঠছে—
শিল্প সংগঠন না রাজনৈতিক সিঁড়ি ?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাতেমের নেতৃত্বে বিকেএমইএ বারবার রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়েছে। শিল্পখাতের ন্যায্য দাবি, শ্রমিক সংকট বা রপ্তানি সমস্যার চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সভাপতির ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভূমিকা।
একজন সাবেক শিল্প নেতা মন্তব্য করেন,“বিকেএমইএ এখন শিল্প সংগঠন কম, রাজনৈতিক লবিং প্ল্যাটফর্ম বেশি হয়ে গেছে।”
নীরবতা কেন ?
এত অভিযোগ, বিতর্ক ও গুঞ্জনের পরও মোহাম্মদ হাতেমের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তিনি না অস্বীকার করছেন, না ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। এই নীরবতাই প্রশ্নকে আরও ঘনীভূত করছে।
ক্ষমতার পালাবদলের এই সময়ে নারায়ণগঞ্জের মানুষ জানতে চায়—
মোহাম্মদ হাতেম কি আবারও সময়ের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে নিতে পারবেন, নাকি এবার তার অতীতই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় বাধা?
একটি প্রশ্ন এখন স্পষ্ট—
শিল্পের নামে রাজনীতি আর রাজনীতির নামে সুবিধাবাদ—এই চক্র কি কখনো ভাঙবে ?