
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
পদ্মা অয়েল পিএলসির নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে ঢাকার কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে সরবরাহের পথে ৭২ হাজার লিটারের বেশি জেট ফুয়েল (জেট এ–১) গায়েব হওয়ার ঘটনা ধরা পড়েছে।
গত ১১ মার্চ সংঘটিত এ ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্তে রেকর্ড জালিয়াতি, কাটাছেঁড়া এবং ভুয়া ‘পরিবহন ক্ষতি’ দেখিয়ে তেল আত্মসাতের চিত্র উঠে এসেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, ওই দিন সকালে গোদনাইল ডিপো থেকে চারটি ট্যাংকলরি জেট ফুয়েল বোঝাই করে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর (কেএডি) উদ্দেশে রওনা দেয়।
কাগজে-কলমে দেখানো হয়, সন্ধ্যায় এসব গাড়ি ডিপোতে প্রবেশ করেছে এবং জ্বালানি গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ট্যাংকলরিগুলোর একটিও ডিপোতে ঢোকেনি।
তদন্ত কমিটি জানায়, ডিপোর গেট রেজিস্টার, জ্বালানি গ্রহণের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হকের নির্দেশে নিরাপত্তাকর্মীরা গাড়ি না ঢুকলেও নিবন্ধন বইয়ে প্রবেশ দেখান বলে স্বীকার করেছেন নিরাপত্তারক্ষী মানিক কুমার রায় ও সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. শওকত হোসেন।
এছাড়া চুক্তিভিত্তিক জুনিয়র কর্মকর্তা ছমীর উদ্দিন ও চেকার আকতার কামাল জ্বালানির ডিপ (গভীরতা), তাপমাত্রা ও পরিমাণ সংক্রান্ত তথ্য জাল করে গ্রহণ দেখান। ফলে চারটি ট্যাংকলরি থেকে মোট ৭২ হাজার ১৩২ লিটার জেট ফুয়েল কাগজে-কলমে গ্রহণ দেখানো হলেও বাস্তবে তা ডিপোতে পৌঁছেনি।
পরবর্তীতে এই গরমিল আড়াল করতে ট্যাংকের মজুত রেকর্ডে কাটাছেঁড়া ও ঘষামাজা করা হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, ১১ মার্চের হিসাবে একটি ট্যাংকে ৪ লাখ ৩৭ হাজার ২৭৩ লিটার জ্বালানি থাকার কথা থাকলেও পরদিন তা দেখানো হয় ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫৪৬ লিটার। পার্থক্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৩ হাজার লিটার, যা ‘পরিবহন ক্ষতি’ হিসেবে দেখানো হয়—যদিও ওই দিন কোনো পরিবহন কার্যক্রম ছিল না।
পদ্মা অয়েল সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে প্রথমে জেট ফুয়েল ট্যাংকারে করে গোদনাইল ডিপোতে আনা হয়। সেখান থেকে চুক্তিবদ্ধ ১২৭টি ট্যাংকলরির মাধ্যমে প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন জ্বালানি কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে সরবরাহ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি নিবন্ধন বই, সিসিটিভি, ডিপ রেকর্ড, তাপমাত্রা ও ঘনত্ব পরিমাপসহ একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হলেও সেই ব্যবস্থার মধ্যেই সংঘবদ্ধ চক্র তৈরি হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হককে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর সঙ্গে ছমীর উদ্দিন, আকতার কামাল, শওকত হোসেন ও মানিক কুমার রায়ের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ঘটনার পর এই পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিপোর আরও আটজন কর্মীকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে সাইদুল হক অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে এবং অন্য কর্মকর্তারা এতে জড়িত থাকতে পারেন।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিপিসির পক্ষ থেকেও পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, “তদন্তে তেল গায়েব হওয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। কীভাবে এবং কোথায় তেল সরানো হয়েছে, তা উদ্ঘাটনে আরও তদন্ত হবে।”
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি খাতের মতো সংবেদনশীল ব্যবস্থায় এ ধরনের জালিয়াতি শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও আস্থা কমিয়ে দেয়।