
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জে অপহরণ ও গুমের শিকার যুবক শুভর নির্মম পরিণতি যেমন ছিল ভয়াবহ, তেমনি তার মায়ের জীবনাবসানও হয়ে উঠেছে এক মর্মান্তিক প্রশ্নচিহ্ন।
বিচারহীনতার অভিযোগ, আসামিদের প্রকাশ্য দাপট আর প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন জনমনে ক্ষোভের আগুন জ্বালাচ্ছে।
ফতুল্লার পূর্ব ইসদাইর রসূলবাগ এলাকার ঝুট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহেলের ছেলে শুভকে গত ২৯ মার্চ ডেকে নিয়ে যায় একটি চক্র।
পরিবারের অভিযোগ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে মারধর করে গুরুতর আহত অবস্থায় অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি।
পরবর্তীতে ৩০ মার্চ সড়কের পাশ থেকে অজ্ঞাত এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
মরদেহের মাথা, মুখমণ্ডল, হাত-পা ও বুকে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। পরে পরিবার ছবি ও পোশাক দেখে শনাক্ত করে—এটি তাদেরই ছেলে শুভ।
এই ঘটনায় প্রথম থেকেই একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করলেও, পরিবারের দাবি—পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়নি।
শুভর বাবা সোহেল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অপহরণের রাতেই থানায় গেলেও মামলা নেয়নি পুলিশ, তিনদিন পর মামলা নেয়। তার দাবি, শুরুতেই অভিযান চালানো হলে হয়তো ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়া যেত।
২ এপ্রিল শুভর মা মাকসুদা বেগম বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন।
মামলায় মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সাখাওয়াত ইসলাম রানা সহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। এছাড়া আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে পরিবারের অভিযোগ, আসামিরা গ্রেপ্তার এড়িয়ে প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ, মিছিল করে গেছে। এমনকি কেউ কেউ বিদেশে পালিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।
জীবদ্দশায় মাকসুদা বেগম বারবার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলতেন, তিনি নিরাপদ নন—তার প্রতিটি পদক্ষেপের খবর আসামিদের কাছে পৌঁছে যায়। তার ভাষায়, “ওরা পুলিশ-থানা ম্যানেজ করছে”—এই অভিযোগ এখন আরও জোরালোভাবে উঠছে।
অবশেষে সেই আশঙ্কাই যেন সত্যি হলো।
২ মে জালকুড়ি এলাকায় অটোরিকশায় ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস লেগে মারা যান মাকসুদা বেগম।
পরিবার বলছে এটি দুর্ঘটনা, তবে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এটি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো পর রহস্য ?
ঘটনার আরেকটি দিকও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, অপহরণের আগে শুভ নিজেই একটি হামলার ঘটনায় জড়িত ছিলেন।
২৫ মার্চ চাষাঢ়া রেললাইনের পাশে সাখাওয়াত রানার গ্যারেজে হামলার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এরপর থেকেই বিরোধ চরমে ওঠে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটে অপহরণ।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—একজন যুবককে প্রকাশ্যে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা, তার পরিবারকে ভয়ভীতি, আসামিদের প্রকাশ্য দাপট—সবকিছুর পরও কেন কার্যকর প্রতিরোধ বা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেল না ?
একদিকে সন্তানের লাশ, অন্যদিকে মায়ের করুণ মৃত্যু—নারায়ণগঞ্জের এই ঘটনাটি এখন বিচারহীনতার এক নগ্ন উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সকল আসামিকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এমন ঘটনা আরও বাড়বে।