
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সাংবাদিক সমাজে একটি নাম দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তি, ক্ষোভ ও আতঙ্কের প্রতীক—মীর আব্দুল আলীম।
যিনি একসময় ছিলেন একজন সাধারণ গার্মেন্ট শ্রমিক, কিন্তু অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, গবেষক, শিল্পপতি এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী সংগঠনের নেতা হিসেবে।
এই ‘অস্বাভাবিক উত্থান’ ঘিরে এখন প্রশ্নের পাহাড়—তিনি কীভাবে হলেন কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক ?
কীভাবে পেলেন জাতীয় ও স্থানীয় প্রেস ক্লাবগুলোতে নিয়ন্ত্রণ ?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সাংবাদিকতার নামে তিনি কী চালিয়েছেন ক্ষমতার বাণিজ্য ?
ক্ষমতাধরদের নাম ভাঙিয়ে ‘ত্রাসের রাজত্ব’
স্থানীয় সাংবাদিক ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর, শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান, আড়াইহাজারের প্রভাবশালী এমপি নজরুল ইসলাম বাবু এবং এমনকি পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এসপি থেকে ডিআইজি পদে উন্নীত হারুন অর রশীদের নাম ব্যবহার করে রূপগঞ্জে ভয়ভীতি ও দাপট চালাতেন মীর আব্দুল আলীম।
অভিযোগ রয়েছে—তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট থাকার পরও তিনি প্রকাশ্যে এসব প্রভাবশালী নাম ব্যবহার করে এক টেবিলে খাবার খাওয়ার গল্প ছড়িয়ে এলাকায় ‘অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতাবান’ হিসেবে নিজেকে জাহির করতেন।
এই ভয় দেখানোই ছিল তার প্রধান অস্ত্র।
জাল সনদ ও পরিচয়ের ধোঁয়াশা
আলীম নিজেকে শিক্ষিত কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক হিসেবে দাবি করলেও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
সার্টিফিকেট জালিয়াতির অভিযোগ বহুদিনের, কিন্তু এখনো পর্যন্ত তার শিক্ষাজীবনের কোনো স্বচ্ছ, যাচাইযোগ্য প্রমাণ সামনে আসেনি।
প্রশ্ন উঠেছে—
যে ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতাই অস্পষ্ট, তিনি কীভাবে জাতীয় পর্যায়ের ‘বুদ্ধিজীবী’ সেজে ওঠেন ?
প্রেস ক্লাব : সাংবাদিকতার নয়, ব্যক্তিগত অস্ত্র ?
অভিযোগকারীদের দাবি—
টাকার বিনিময়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানীয় প্রেস ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে নেন আলীম। এরপর সেই প্রেস ক্লাবগুলোকে ব্যবহার করেন নিজের স্বার্থে—
✔ সত্য সংবাদ ঠেকাতে
✔ ভিন্নমত দমনে
✔ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলা ও মামলা চাপাতে
২০২০ সালে রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাবের কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে সত্য তথ্য প্রকাশ করায় তাদের বিরুদ্ধে হঠাৎ ‘চাঁদাবাজি’র অভিযোগ তুলে বহিষ্কার করা হয়।
এরপর ইমদাদুল হক দুলালের বাসায় হামলার অভিযোগ ওঠে—যেখানে তার স্ত্রী-সন্তান পর্যন্ত ভয়াবহ আতঙ্কের মুখে পড়েন।
সাংবাদিকদের ভাষায়—
“প্রেস ক্লাব যেন ছিল তার ব্যক্তিগত ফার্মহাউজ।”
ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি ও হুমকির রাজনীতি রূপগঞ্জের একাধিক সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন—আলীম তার সঙ্গে তোলা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছবি দেখিয়ে বলতেন, “আমার কথা না শুনলে মামলা-হামলা দিয়ে শেষ করে দেব।”
কারও বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতে হলে আগে লাগত তার অনুমতি।
না মানলেই শুরু হতো চাপ, অপমান, তদ্বির, এমনকি মিথ্যা মামলার ভয়।
সত্য সাংবাদিকতাই হয়ে উঠেছিল তার প্রধান শত্রু।
সম্পদের পাহাড়: শ্রমিক থেকে ‘কোটিপতি’—কীভাবে ?
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে যে সম্পদের তালিকা উঠে এসেছে, তা একজন উপজেলা-পর্যায়ের সাংবাদিক তো দূরের কথা—মাঝারি মানের ব্যবসায়ীর পক্ষেও কল্পনাতীত।
অভিযোগ অনুযায়ী তার সম্পদের মধ্যে রয়েছে—
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—“একজন সাধারণ শ্রমিক কীভাবে কয়েক বছরে এমন সাম্রাজ্যের মালিক হয় ?”
সাংবাদিকতার সুনাম ধ্বংসের প্রতীক?
রূপগঞ্জের প্রবীণ সাংবাদিকদের মতে, মীর আব্দুল আলীমের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিরাই সাংবাদিকতা পেশার বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করছে।
তাদের ভাষায়—“তিনি সাংবাদিক নন, সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করা একজন ক্ষমতাব্যবসায়ী।”
দুদকের তদন্ত : শেষ আশার জায়গা
এইসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করেছে।
কোন সম্পদ বৈধ, কোনটি অবৈধ, ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না—সবই এখন তদন্তাধীন।
সাংবাদিক মহলের প্রত্যাশা স্পষ্ট—সত্য উদঘাটিত হোক, এবং সাংবাদিকতার নামে গড়ে ওঠা এই ‘মাফিয়াতন্ত্র’ যেন আর টিকে না থাকে।
সূত্র-নারায়নগঞ্জ নিউজ আপডেট