
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জে বিএনপির ভেতর নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে আবু আল ইউসুফ খান টিপুর সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তনকে ঘিরে! একসময় যিনি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধীতা করেছিলেন। এমনকি মাসুদকে স্বেরাচারী দোসর আখ্যা দিয়ে তার মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার দাবিসহ মাসুদের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে শক্ত অবস্থানও নিয়েছিলেন। সেই টিপুর হঠাৎ আকস্মিক পরিবর্তনে মহানগর বিএনপির বিভিন্ন স্তরে ক্ষোভ, বিস্ময় ও সন্দেহ তীব্র আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই নাটকীয় পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল থেকে শীর্ষস্থান—সব স্তরের নেতাকর্মীদের মাঝেই বইছে প্রশ্নের ঝড়? অনেকেই বলছেন, একসময় যাঁর মনোনয়ন বাতিল দাবি করেছেন, এখন সেই প্রার্থীর পক্ষে টিপুর এমন সক্রিয়তা বেশ রহস্যজনক! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএনপি নেতা বলেন, টিপুর এই ১৮০ ডিগ্রি পল্টি না জানি কত টাকার খেলা !
২৭ নভেম্বর বরফকল মাঠে টিপুর নাটকীয় আত্মসমর্পণ ছিলো চোখ কপালে তোলার মতো। সেদিনের দৃশ্য সবাইকে অবাক করেছে। এই দিনটি ছিল টিপুর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত গণ-আবির্ভাব। সেদিন বরফকল মাঠে মাসুদুজ্জামানকে ঘিরে আয়োজিত বিএনপির নির্বাচনী সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন টিপু , কারণ তিনি শুধু উপস্থিতই ছিলেন না বরং সভাপতির আসনে বসেই মাসুদের পক্ষে জোরালো সমর্থন ঘোষণা করেছেন!
টিপুর এমন কান্ডে বিএনপির বহু নেতা ঘটনাটিকে বলছেন, এটা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়,এটা চুক্তি, এটা ক্ষমতার বেচাকেনা। অন্যদিকে তৃণমূল নেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এটা কি চাপ, লোভ, নাকি দরদাম মিলে যাওয়ার ফল?
গিরগিটি তকমা পাওয়া টিপুর এর আগেও ছিল ভিন্ন সুর। মাত্র কয়েকদিন আগেই নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে টিপু স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, আমরা চাই ত্যাগী, মাঠের কর্মীরা যেন মনোনয়ন পায়। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মনোনয়ন পুনর্বিবেচনা করা হোক। অনেক নেতারাই বলছেন, যেই টিপু সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “নারায়ণগঞ্জ বিএনপিকে বাঁচাও, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনকে বাঁচাও” সেই টিপুই হঠাৎ মাসুদের পক্ষে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের গলা টিপে ধরেছেন।
একজন দলীয় নেতার ভাষ্যমতে, যে টিপু কাল পর্যন্ত বলছিলেন মাসুদের বিরুদ্ধে জনগণ জানে ,আজ তিনি তার কমিটির আহ্বায়ক! এখানে কি রাতারাতি আধ্যাত্মিক আলোর ছটা নেমে এসেছে নাকি অন্যকিছু? দলীয় আরেক নেতা বলেন, যে টিপু গত সপ্তাহেই মাসুদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের দাবি তুলেছিলেন সে সপ্তাহ খানেক পরেই মাসুদের নির্বাচনী কমিটির আহ্বায়ক! এটা কি রাজনীতি, নাকি লেনদেন? বিএনপির অসংখ্য তৃণমূল কর্মী প্রকাশ্যে বলছেন, এটা পরিষ্কার, টিপু নিজের অবস্থান বিক্রি করে দিয়েছেন। টাকার লেনদেন হোক বা শক্তির রাজনীতি কিছু একটা ঘটেছে।
বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, টিপুর অবস্থান বদলের কারনে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির মধ্যে ভয়াবহ বিভাজন তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন টিপু দুর্নীতিগ্রস্ত শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। আবার অনেকে মনে করছেন টিপু নিজের রাজনৈতিক নিরাপত্তা বাণিজ্যিকভাবে নিশ্চিত করেছেন এবং এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটি হিসাবি সিদ্ধান্ত।
বিএনপির কিছু স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, মাসুদ অতীতে বহুবার “আওয়ামী ফ্যাসিবাদ” এবং নারায়ণগঞ্জের বিতর্কিত ওসমান পরিবারের সঙ্গে সখ্যতা রেখেছেন। সেই কারণেই তৃণমূলের একটি অংশ তার মনোনয়ন নিয়ে আগে থেকেই অসন্তুষ্ট ছিল টিপু নিজেও ছিলেন নারাজ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টিপুর হঠাৎ এমন ঝুঁকে পড়া মাসুদকে ঘিরে তৃণমূলের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, এই ঘটনা শুধু টিপুর অবস্থান বদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে মাসুদুজ্জামান মাসুদের প্যানেল এর ভেতর টাকার রাজনীতি, গ্রুপিং, স্বার্থবাণিজ্য সবকিছুই তীব্রভাবে সক্রিয়। টিপুর এই অবস্থান পরিবর্তন শুধু একজন নেতার সিদ্ধান্ত নয় এটি নারায়ণগঞ্জ বিএনপির ভবিষ্যৎ একতার ওপর বড় আঘাতও বটে।
টিপুর এমন পল্টি এখন নারায়ণগঞ্জ বিএনপির জন্য বড় আশ্চর্যের। দল, তৃণমূল, কর্মী সবার মুখে মুখে এখন প্রশ্ন , টিপু মাসুদের দলে কেন গেলেন ? কোন বিনিময়ে গেলেন? চাপ, চুক্তি, নাকি রাজনৈতিক ব্যবসা? এমন বিতর্ক নিয়েই এখন উত্তাল নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি।
কিন্তু কেউ উত্তর দিচ্ছে না, কোন উত্তর মিলছে না। তবুও নারায়ণগঞ্জ বিএনপির গুঞ্জন এখন সবচেয়ে জোরালো, “কত টাকায় বিক্রি হলেন টিপু?