
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
ভোরের কুয়াশা ভেজা গ্রামে টিনের ঘরের এক কোণে কাঠের পিঁড়ি। সেই পিঁড়িতে বসে বছরের পর বছর ধরে শাড়িতে সুতোয় নকশা এঁকেছেন এক নারী। আঙুলের ফাঁকে জন্ম নিয়েছে শত শত জামদানি শাড়ি- যেগুলো গিয়েছে শহরের দোকানে, কারও উৎসবে, কারও বিয়ের সাজে। অথচ সেই নারী, মাসুদা বেগম, নিজের গায়ে কোনোদিন একটি জামদানি জড়াতে পারেননি।
দীর্ঘ ছয় দশকের জীবনে প্রথমবারের মতো যখন একটি জামদানি শাড়ি তার কাঁধে তুলে দেন ছেলে ইয়াকুব, তখন আনন্দ আর বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে ভিজে ওঠে তার চোখ।
মুচকি হেসে তিনি বললেন, ‘অনেক আনন্দ লাগতাছে। এই শাড়িটা আমি অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠানে পিনবো। পরে ভাঁজ কইরা রেখে দিমু।”
কিন্তু এই আনন্দের পেছনে আছে দীর্ঘ কষ্টের ইতিহাস।’
মাসুদা বেগম জানান, মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি স্বামীর কাছ থেকে পুটি (তাঁত) বোনা শিখেছিলেন। শখে নয়, বাধ্য হয়েই।
‘আমি ২৩ বছর বয়স থেকে ১১ বছর পুটি বুনছি। ভাতের অভাবে। পোলাপানরে ভাত খাইতে দিতে পারি নাই’—কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন তিনি।
স্বামী তাওলাত প্রধানের সঙ্গে বসে দিনের পর দিন তাঁত বুনেছেন তিনি। কখনো সন্তানদের কোলে নিয়ে, কখনো আবার সন্তানদেরই পুটিতে বসিয়ে। ‘স্বামীর সাথে পুটি বুনছি, সন্তানদের নিয়া পুটি বুনছি। পোলাপানরে লেখাপড়া শিখাইতে পারি নাই অভাবে,’—বলতে বলতেই থেমে যান তিনি। এখন আমার সুখে কান্না আসে, দুখে না, ললেন মাসুদা।
বড় ছেলে ওয়াসিমের বয়স যখন মাত্র আট বছর, তখনই তাকে তাঁতে বসতে হয়েছিল। মাসুদা বেগম বলেন, ‘বড় পোলা ওয়াসিমরে আট বছর কালে পুটিতে বসাইছি। পুটি লাগ পায় নাই, বালিশ দিয়া বসাইছি। ওর ছোট ভাইগুলারে পালার লাইগা।’
কিন্তু ছোট্ট শিশুর পক্ষে সেই কাজ সহজ ছিল না। ‘ও পুটি বানাইতে পারে নাই দেইখা ওর বাবা মাইরা হাড্ডিগুড়া কইরা ফেলছে। তাই পরে নিজের পুটিতে না দিয়া মানুষের পুটিতে দিছি,’—স্মৃতি মনে করে বলেন তিনি।
বিয়ের পর স্বামীর কাছেই তাঁত বোনা শিখেছিলেন মাসুদা বেগম। কিন্তু এই কাজকে ভালো চোখে দেখত না গ্রামের মানুষ। তিনি বলেন, ‘এই গ্রামের কেউ এই কাজটারে ভালো চোখে দেখতো না। যখন আমার মাইয়া লায়েক হইছে, তখন ভাবতাম- মানুষ কইবো পটিগো মাইয়া নিমু না। এই আশঙ্কায় একসময় তাঁত বোনা বন্ধও করে দিয়েছিলেন তিনি। মাইনসে এই কাজটারে অবহেলা করতো। তাই হেশুমগাওই পুটি বুনা বন্ধ কইরা দিছি।’
তার স্বামী তাওলাত প্রধান বলেন, জামদানি বুনে সংসার চালানো ছিল কঠিন। আমি ৯ বছর বয়স থেইকা কাজে বইছি। ১১ বছর ইয়াকুবের মায়েরে লইয়া জামদানির কাজ করছি। তখন জামদানির কোনো মূল্যায়ন ছিল না সপ্তাহের পর সপ্তাহ কষ্টের জীবন কাটাতে হয়েছে।
‘যেই টাকা পারিশ্রমিক পাইতাম, এই টাকায় খাওন-দাওন চলতো না। শুক্রবার হইলে পোলাপান উপোস থাকতো—হাড়ি বয় নাই, চাইল আছিল না। তখনই কান্না আসতো।’
বড় ছেলে ওয়াসিম বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার মনে একটা স্বপ্ন ছিল একদিন মাকে একটা জামদানি শাড়ি পরাবেন। তিনি বলেন, আমার বয়স যখন আট বছর, তখনই পুটিতে বসছি। অনেক জামদানি বানাইছি জীবনে। কিন্তু যখন মানুষ অনুষ্ঠান করে জামদানি পরে যাইতো, তখন মনে হইতো আমার মায়েরে যদি একটা শাড়ি পড়াইতে পারতাম।
কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তব করা সম্ভব ছিল না। সারা সপ্তাহে একটা শাড়ি বুনতাম। যদি সেই শাড়ি মাকে দেই, তাহলে আমরা খাব কি?- বললেন তিনি।
ছেলে ইয়াকুবের হাত ধরেই বদলে যেতে শুরু করে এই পরিবারের ভাগ্য। তিনি জানান, এক সময় একটি জামদানি শাড়ি বিক্রি হতো ৭০০–১২০০ টাকায়। পাইকারদের কাছে বিক্রি করলে পুরো টাকা পাওয়াও কঠিন ছিল। ইয়াকুব বলেন, দোকানদার দুই লাখ টাকার শাড়ি নিলে এক লাখ টাকা দেয়, বাকি টাকা আটকে রাখে।
পরে তিনি অনলাইনে শাড়ির ছবি দিতে শুরু করেন। তিনি বলেন, দুই তিনবার বুস্ট করলাম। এরপর অনলাইনে আপুরা আমাকে সাপোর্ট দিলেন। এখন সবাই আমাকে চিনে ‘ইয়াকুব জামদানি’ নামে। অনলাইনের মাধ্যমেই প্রথমবার বিদেশে শাড়ি বিক্রি করেন তিনি।
‘আমার জীবনের প্রথম শাড়ি আমেরিকায় বিক্রি করি ৫০ হাজার টাকায়। এরপর ওই আপুর রেফারেন্সে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকেও অর্ডার আসে।’
নিজের শোরুম উদ্বোধনের দিন হঠাৎই তার মনে হলো যে মা সারাজীবন জামদানি বুনেছেন, তাকে তো কখনো একটি শাড়িও পরানো হয়নি।
ইয়াকুব বলেন, আমি এখন অনেক দামি শাড়ি বিক্রি করি। আমার মা এত কষ্ট করে শাড়ি বুনছে। তাই শোরুম উদ্বোধনের দিন ভাবলাম—আমার মাকে একটা শাড়ি পরামু। সেদিন তিনি মাকে সুরমাদানি নকশার একটি জামদানি শাড়ি কিনে উপহার দেই।
‘শাড়িটা পাইয়া আমার মা অনেক খুশি হইছে। আমার মাকে শাড়ি দেওয়ার পর মনে হইছে আমার জীবনে আর কিছু চাওয়ার নাই।’মায়ের সেই শাড়ি পরা ছবি তিনি ফেসবুকে দেন। অল্প সময়েই ছবিটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে।
তবে কিছুদিন আগেই মাসুদা বেগমের ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা হয়। তিনি বর্তমানে কিছুটা সুস্থ। ছেলেরা ছয় লাখ টাকা খরচ করে তার চিকিৎসা করিয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, আমার ব্রেন টিউমার হইছিল। অ্যাম্বুলেন্সেে নিয়া গেছিল পোলাপান। ছয় লাখ টাকা দিয়া চিকিৎসা করাইছে। এখন ১৫ দিন ধইরা একটু সুস্থ আছি।
অসুস্থদার কারণে তার কণ্ঠের পরিবর্তন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে কথা কইলে পোলাপান বুঝতো না। এখন কণ্ঠটা অন্যরকম হইছে। তবু তার চোখে এখন তৃপ্তি। মুচকি হাসি দিয়ে মাসুদা বেগম বলেন, এই জামদানিটাই আমগো খাওয়া-পরার সবকিছু। আমরা মা-ছেলে-বাবা সবাই এই কাজ করি।