
যুগের নারায়নগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের বিভাগীয় শ্রম দপ্তরকে ঘিরে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জনমনে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
দপ্তরের পরিচালক আফিফা বেগম এবং সহকারী পরিচালক ইয়াছমিন আক্তার–এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ কুদ্দুছ আলী সরকার সরেজমিনে তদন্ত শুরু করেছেন।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) নারায়ণগঞ্জ চাষাঢ়ায় দপ্তরের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে তিনি অভিযোগকারী ও অভিযুক্তদের পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু : কমিটি অনুমোদন
অভিযোগ অনুযায়ী, সিদ্ধিরগঞ্জের মিতালি মার্কেট দোকানদার সমিতির নির্বাচিত কার্যকরী কমিটি বহাল থাকা এবং বিষয়টি হাইকোর্ট ও শ্রম আদালতে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও গত বছরের ১১ অক্টোবর নতুন ২৯ সদস্যের আরেকটি কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক শুদ্ধাচার ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগের কমিটির কোষাধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম মঞ্জু ২১ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম করা হয়েছে।
জমি ও আর্থিক সুবিধা–সংক্রান্ত অভিযোগ
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ রয়েছে, চাষাঢ়া শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের ১০ শতাংশ সরকারি জমি সংক্রান্ত মামলায় প্রভাব খাটিয়ে বিপুল আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে জেলার বিভিন্ন শিল্প ও ট্রেড ইউনিয়ন কমিটির নেতাদের হয়রানির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের কথাও অভিযোগে উঠে এসেছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সহকারী পরিচালক ইয়াছমিন আক্তার দাবি করেছেন, সবকিছু দাপ্তরিক নিয়মনীতি মেনেই করা হয়েছে এবং কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি।
পরিচালক আফিফা বেগমও অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেছেন।
প্রশাসনিক জবাবদিহিতা কোথায় ?
সরকারি দপ্তরের কাজ হলো শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা, ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিন্তু যখন সেই দপ্তরই বিতর্কে জড়ায়, তখন আস্থা সংকট তৈরি হয়। বিচারাধীন বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা শুধু আইনগত জটিলতা নয়, নৈতিক প্রশ্নও তোলে।
দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আবার অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে, তা দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা জরুরি—যাতে দপ্তরের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে।
করণীয় কী ?
১. স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত: তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে।
২. দলিলপত্র প্রকাশ: সংশ্লিষ্ট কমিটি অনুমোদনের নথি, আইনি মতামত ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
৩. দীর্ঘদিন একই পদে থাকা কর্মকর্তাদের বদলি নীতি: দীর্ঘ সময় এক দপ্তরে দায়িত্ব পালনের ফলে প্রভাব বলয় তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে—এ বিষয়ে নীতিগত পর্যালোচনা জরুরি।
৪. দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান: অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
নারায়ণগঞ্জের শ্রম দপ্তরকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ কেবল একটি প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; এটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরীক্ষাও বটে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং একই সঙ্গে ন্যায়সংগত তদন্ত নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে সত্য উদঘাটন ও দায় নিরূপণ—দুই-ই অপরিহার্য।