
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের মদনপুর–মদনগঞ্জ সড়ক এখন যেন গর্তের প্রদর্শনী। পিচ উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় খাদ। কোথাও সড়ক দেবে গেছে, কোথাও চাকা আটকে যাচ্ছে গর্তে। ঝুঁকি নিয়েই চলছে যানবাহন। প্রায়ই উল্টে যাচ্ছে ট্রাক, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অথচ ২ বছর আগেই ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছিল এই সড়ক।
২০২৩ সালের শেষদিকে ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের সংস্কারকাজ শেষ হয়। শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় এটি এখন নারায়ণগঞ্জ জেলার অন্যতম ব্যস্ত সড়ক। বর্তমানে সড়কটির বিভিন্ন স্থানে ফাটল, গর্ত ও পিচ উঠে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষায়, সড়কটি এখন ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে।
সংস্কার শেষ, শুরু ভাঙন:
সরেজমিনে দেখা গেছে, নয়ামাটি, ভাঙতি ব্রিজ, লক্ষণখোলা, নবীগঞ্জ ও আকিজ সিমেন্ট কারখানার সামনে সড়কের বড় অংশ জুড়ে পিচ উঠে বড় গর্তে পরিণত হয়েছে। কোথাও গর্তের গভীরতা এতটাই যে যানবাহনের চাকা পুরোপুরি ঢুকে বিকল হয়ে পড়ছে। সন্ধ্যার পর আলোস্বল্পতায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বন্দর শাব্দি এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, এই রাস্তার কাজ করে লাভ কী? রাস্তার দুই পাশে শক্ত বাঁধ না দিলে কখনোই এই রাস্তা টেকানো যাবে না। কারণ এখানে প্রতিদিন যে পরিমাণ ভারি ট্রাক ও সিমেন্ট বোঝাই লরি চলে, তাতে রাস্তা ঠিক করলেই আবার গর্ত হয়ে যাবে। এভাবে উন্নয়নের নামে কাজ করলে আসলে কোনো লাভ হয় না। শেষ পর্যন্ত সব টাকাই কন্ট্রাক্টরদের পকেটে চলে যায়। এই সড়কে গাড়ি উল্টে যাওয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনের বিষয়।
ট্রাকচালক আবদুল মালেক বলেন, এই সড়কে চালাতে গেলে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। কোথায় গর্ত, কোথায় রাস্তা দেবে গেছে—বোঝার উপায় নেই। একটু ভুল হলেই গাড়ি উল্টে যেতে পারে। বহুবার নিজের চোখে দুর্ঘটনা দেখেছি। রাস্তার এই অবস্থার দায় কেউ নেয় না।
কলেজছাত্রী রিতু আক্তার বলেন, প্রতিদিন কলেজে যেতে এই রাস্তা ব্যবহার করি। বৃষ্টি হলে গর্তগুলো পানিতে ঢেকে যায়, তখন বোঝাই যায় না কোথায় রাস্তা আছে আর কোথায় নেই। অনেক সময় অটো রিকশা থেমে যায়, আবার কাত হয়ে উল্টে যায়। ভয় নিয়েই চলতে হয়।
লক্ষণ খোলা এলাকার অটোরিকশা চালক জামাল হোসেন বলেন, রাস্তা ভালো না থাকায় যাত্রী উঠাতে ভয় লাগে। একটু ঝাঁকুনি খেলেই যাত্রী পড়ে যেতে পারে। গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে প্রায়ই অন্য গাড়ির সঙ্গে লেগে যায়। সংস্কারের নামে যে কাজ হয়েছে, সেটা চোখে পড়ে না।
সড়ক ঘেষা গোকুলদাস বাজারের রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী হাসমত আলী বলেন, এই রাস্তার জন্য আমাদের ব্যবসাও মার খাচ্ছে। দুর্ঘটনা হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। ক্রেতারা আসতে চায় না। এত টাকা খরচ করে যদি রাস্তা এমন হয়, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়?
দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে:
বন্দর থানা পুলিশ জানায়, গত এক বছরে এই সড়কে অন্তত বিশটিরও বেশি বড় দুর্ঘটনার তথ্য রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এছাড়া প্রতিনিয়ত সড়কটিতে চাকা দেবে গিয়ে বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটে অহরহ। এতে পুরো রাস্তায় প্রচুর যানজট সৃষ্টি হয়।
বন্দর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দীন বলেন, মদনপুর–মদনগঞ্জ সড়কের বর্তমান অবস্থা আমাদের জন্যও উদ্বেগের। সড়কটির বিভিন্ন স্থানে বড় গর্ত ও দেবে যাওয়ার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। গত কয়েক মাসে একাধিক দুর্ঘটনার খবর পেয়েছি। জননিরাপত্তার স্বার্থে আমরা নিয়মিত টহল দিচ্ছি এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করছি। সড়কটির অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ। এটি বর্তমানে যান চলাচলের জন্য প্রায় অনুপযোগী।সড়কটি পুরোপুরি সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত চালকদের সতর্কভাবে চলাচলের অনুরোধ জানাচ্ছি।
সওজ বলছে ওভারলোড, স্থানীয়দের অভিযোগ অনিয়ম:
সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) বলছে, অতিরিক্ত ওজনের ট্রাকই সড়ক ধ্বংসের প্রধান কারণ। বিশেষ করে আশপাশের সিমেন্ট কারখানার ভারী যানবাহন নিয়মিত এই সড়ক ব্যবহার করছে।
সওজ নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহিম বলেন, ওভারলোডেড গাড়ি এই সড়কে চলার কথা ছিল না। কিন্তু তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। আমরা বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ভিন্ন। তারা বলছেন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও নির্মাণকাজে অনিয়মের কারণেই সড়কটি দ্রুত নষ্ট হয়েছে।
ওভারলোড ট্রাকের দাপট:
ঘণ্টাখানের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মদনপুর–মদনগঞ্জ সড়কে ৪০টি পণ্যবোঝাই ট্রাক চলাচল করছে। যার অধিকাংশই সিমেন্টবাহী। রাতে এ সংখ্যাটি আরও বাড়ে।
অটোরিকশা চালক নিহাজ ইসলাম বলেন, দিন-রাত ভারী লরি চলে। নিয়ম মানে না কেউ। রাস্তা এত ওজন নিতে পারে না, তাই দেবে গেছে।
সওজ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে পুলিশের সহযোগিতায় দুই শতাধিক ভারী যান পরীক্ষা করে ১০–২০ টন অতিরিক্ত ওজন বহনের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে অভিযান বন্ধ হয়ে যায়।
শাহ সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপক (রোড ট্রান্সপোর্ট অপারেশন) মনির উদ্দিন আহমেদ অতিরিক্ত ওজন বহনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমরা নিরুপায়। রাস্তাটি এত লোডের জন্য তৈরি হয়নি—এটা আমরা মানি। তবে বিকল্প না থাকায় এই পথই ব্যবহার করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পঞ্চবটি–মোড়কাতপুর সড়কের কাজ শেষ হলে ভারী যান আর এই সড়ক ব্যবহার করবে না।
৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প, সংস্কারের অল্প কিছু দিনেই বিপর্যয়
সওজ সূত্রে জানা গেছে, তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু চালুর পর গুরুত্ব বাড়ায় সড়কটি প্রশস্ত ও সংস্কার করা হয়। পুরোনো চারটি কালভার্ট ভেঙে নতুন করে নির্মাণ, একটি সেতু ও ওভারলেপসহ মোট ব্যয় হয় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। সড়কের প্রশস্ততা ৫.৫ মিটার থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৭.৩ মিটার। তবে সংস্কারের ছয় মাস পর থেকেই সড়কটির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রহিম বলেন, মদনপুর–মদনগঞ্জ সড়কের সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং কাজ চলমান রয়েছে। সাময়িক মেরামতের পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে কাজ সম্পন্ন করা হবে। সংস্কারকাজ শেষ হলে সড়কটি নিরাপদ ও যান চলাচলের সম্পূর্ণ উপযোগী হবে।