যুগের নারায়ণগঞ্জ:
গত চার পাঁচ দিন যাবত পেঁটে কোন ভাত জুটছে না। কামায় রুজিও এখন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। হত্যার হুমকির কারণে ভাড়া বাড়িতেও ফিরতে পারছি না। বাধ্য হয়ে রাস্তায় দুই মেয়েকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হচ্ছে। সংঘবদ্ধ ধর্ষনের শিকার আমার স্ত্রীর অবস্থাও ভালো নেই। হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় ভর্তি হয়ে সে কাতরাচ্ছে। পেটের ক্ষুধা আর স্ত্রীর অবস্থা দেখে আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে বাসের নিচে ঝাঁপ দেই। মনের দুঃখ, হতাশা আর দুঃখ চিরতরে নিবিয়ে দেই। সবাই আমার পরিবারের করুন পরিনতি দেখতে আসে। কেউ আমাদের টাকা-পয়সা বা খাবার দিয়ে সাহায্য করেনা। গতকাল রোববার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালের সামনে কান্না বিজড়িত কন্ঠে এ কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার জামপুর ইউনিয়নের শিরাব এলাকায় গত ১০ জুন যুবদল নেতা ও তার সহযোগীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগী এক নারীর স্বামী।
ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগী ওই নারীর স্বামীর দাবী, দারিদ্রতার কারণে তিনি নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। একারণে তিনি নিজের গ্রাম চাঁদপুরের মতলব এলাকা ছেড়ে সোনারগাঁয়ের শিরাব এলাকায় তার স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছিলেন। গত ১০ জুন সকালে তিনি স্থানীয় সাদীপুর ইউনিয়নের কোনাবাড়ি এলাকায় বিল্ডিংয়ের নির্মাণ কাজ করতে যান। দুপুরে বাড়িতে ফিরে আবার বিকেলে ওই নির্মাণ কাজের পারিশ্রমিকের টাকা আনতে বের হন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তার স্ত্রী রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। ওই অবস্থায় সোনারগাঁ উপজেলার জামপুর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোঃ শহীদ ও সহযোগী শাহিন মিয়া তার মুখ চেপে ধরে সন্তানদের ভয়ভীতি দেখিয়ে পাশের একটি চারতলা ভবনের নিচতলায় নিয়ে যায়। সেখানে একটি কক্ষে নিয়ে তারা আমার স্ত্রীকে হাত ও মুখ বেঁধে সংঘবদ্ধ ভাবে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। পরে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে তার স্ত্রী ওই ভাড়া বাসায় ফিরে যান। সন্ধ্যার পর আমি নির্মাণ কাজের পারিশ্রমিকের টাকা নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসার পর আমার স্ত্রী আমাকে পুরো ঘটনাটি অবহিত করে। পরবর্তীতে আমরা সোনারগাঁ থানায় উপস্থিত হয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত শুরু করে ও শুক্রবার (১২ জুন) রাতে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত জামপুর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোঃ শহীদ ও সহযোগী শাহিন মিয়াকে গ্রেফতার করে। এই ঘটনায় থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। তবে, থানায় মামলা দায়ের করার সময় উপজেলা বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা আমাদেরকে মামলা দায়ের করতে বাধা সৃষ্টি করে ও ভয়ভীতি দেখায়। নিরাপত্তার কারণে আমরা তার নাম প্রকাশ করতে পারছি না।
ধর্ষিতার স্বামী জানান, মামলা দায়েরের পর থেকে মামলার আসামি, তাদের পরিবার ও তাদের দলীয় লোকজন আমাদেরকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য অব্যাহতভাবে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। তারা মনে হয় আমাদেরকে মেরে ফেলবে। আমরা এখন কি করব? কোথায় যাবো? আমাদেরকে কে নিরাপত্তা দিবে? আমরা কার কাছে গেলে ন্যায় বিচার পাবো? তাদের হুমকির কারণে এখন আমরা ভাড়া বাসায় যেতে পারছি না। ধর্ষণের শিকার অসুস্থ স্ত্রী ও দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালের সামনে রাস্তার পাশে বসবাসের ঠিকানা বের করেছি। পেটে কোন খাবার নেই। হাসপাতালের সামনে রাস্তার পাশে অসুস্থ স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতে দেখে হাসপাতালের আরএমও জহিরুল ইসলাম ও চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা আমার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তির ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেন, আমি এখন নিরাপত্তার অভাবে আমার দুই মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় জীবন যাপন করছি। আমার কাছে কোন টাকা নেই। খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই। দুই সন্তানকে নিয়ে চারদিন যাবত অনাহারে জীবন যাপন করছি। তবুও আমি ন্যায় বিচার চাই। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। তারা আমার পুরো পরিবারটাকে ধ্বংসের দারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমার স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ভাবে ধর্ষণ করেছে। এই মুখ আমি মানুষকে কিভাবে দেখামু। কান্না ছাড়া আমার আর এখন কিছুই করার নেই।
ধর্ষিতা ওই নারীর স্বামী আরও জানান, থানায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ ডাক্তারি পরীক্ষা করানোর জন্য মুমূর্ষু অবস্থায় তার স্ত্রীকে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ডাক্তারি পরীক্ষা শেষে পুলিশ আমার মুমূর্ষু স্ত্রী ও আমাদেরকে ফেলে রেখেই চলে যান। পরে আমরা হাসপাতালের পাশে খোলা আকাশের নিচে রাস্তায় বসবাস শুরু করি।
সোনারগাঁ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গোলাম সারোয়ার জানান, ঘটনা জানার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী ও তার পরিবারের পুরো নিরাপত্তা দিতে পুলিশ কাজ করছে। মামলার আসামীরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন তাদেরকে ছাড় দেওয়া হবে না। মামলার অন্য আসামিদেরও গ্রেফতার করতে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
সম্পাদক : রনি কুমার দাস, প্রকাশক : মোঃ আল আমিন মিয়া রকি কর্তৃক প্রকাশিত
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : পশ্চিম ভোলাইল মেলিটিরী বাড়ি কাশীপুর ফতুল্লা নারায়ণগঞ্জ।
যোগাযোগ : ০১৫১১-৭০৫৩৮৪, ০১৯১৬-১৮৭২৫৪.
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত