
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
দুই শিংয়ের মাঝখানে সিঁথির মতো ভাঁজ। গোলাপি আভা মেশানো সাদা শরীর। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, যেন সবসময় সতর্ক। কেউ কাছে গেলেই নাক দিয়ে জোরে শব্দ তুলে তেড়ে আসে। খামারের কর্মচারীরা বলেন, প্রতিদিন যারা তাকে খাবার দেয়, গোসল করায়, পরিচর্যা করে—তাদেরও রেহাই নেই। সুযোগ পেলেই গুঁতো দিতে চায়।
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার দাসেরগাঁও এলাকার একটি খামারে থাকা অ্যালবিনো জাতের এই মহিষটির নাম রাখা হয়েছে ‘নেতানিয়াহু’। খামারিদের ভাষ্য, স্বভাবের সঙ্গে মিল রেখেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নামে এমন নামকরণ।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এমনিতেই গরু-মহিষের খামারগুলোতে বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। তবে এস এস ক্যাটেল ফার্মে ঢুকলেই বোঝা যায়, এখানে ভিড়ের কারণ একটু আলাদা। খামারের এক পাশে বাঁশের ঘেরের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মহিষটিকে ঘিরে কৌতূহলী মানুষের ছোট ছোট জটলা। কেউ মোবাইলে ভিডিও করছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ দূর থেকে তার আচরণ দেখছেন। শিশুদের কেউ কেউ ভয় মিশ্রিত বিস্ময়ে বাবার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
খামারের ভেতরে ঢুকতেই কয়েকজন তরুণকে দেখা গেল মহিষটির সামনে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে ভিডিও করতে। হঠাৎ মহিষটি মাথা ঝাঁকিয়ে সামনের দিকে ধেয়ে এলে তারা দ্রুত সরে যান। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কর্মচারী হাসতে হাসতে বললেন, দূর থেইকা দেখেন ভাই, বেশি কাছে গেলে কিন্তু মানসম্মান কিছুই রাখবে না।
গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহিষটির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগে খামারে এত লোকজন আসতে দেখা যেত না। এখন প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। কয়েক সপ্তাহ আগেই নারায়ণগঞ্জে আরেকটি অ্যালবিনো মহিষ আলোচনায় আসে। সেটির মাথার চুল ও চেহারার গড়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিল খুঁজে পেয়ে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। সেই মহিষ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। এবার একই ধরনের আরেকটি অ্যালবিনো মহিষকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কৌতূহল। খামারের কর্মচারীরা বলছেন, মহিষটির আচরণই মূলত তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
এস এস ক্যাটেল ফার্মের ম্যানেজার মেহেদী হাসান বলেন, এটা মূলত অ্যালবিনো জাতের মহিষ। আমাদের খামারে এই ধরনের ছয়টি মহিষ আছে। সবগুলোর স্বভাবই একটু উগ্র। তাই মজা করেই একটার নাম রাখা হয়েছে ‘নেতানিয়াহু’। পরে বাকিগুলোর নাম রাখা হয় ‘নেতানিয়াহু ওয়ান’, ‘টু’, ‘থ্রি’—এভাবে। তিনি বলেন, মানুষ এখন নাম শুনেই দেখতে আসছে। অনেকে শুধু ভিডিও করতে আসে, কেউ আবার কিনতেও আগ্রহ দেখাচ্ছে।
খামারে গিয়ে দেখা যায়, মহিষটির শরীর পুরোপুরি কালো নয়, বরং হালকা গোলাপি আভাযুক্ত সাদা। স্থানীয় ভাষায় অনেকে একে ‘গোলাপি মহিষ’ বলেও ডাকছেন। মাথার সামনের অংশে অল্প চুল, আর মাঝখানে চিরুনির আঁচড়ের মতো সিঁথির ভাঁজ—এই বৈশিষ্ট্যই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।
দর্শনার্থীদের কেউ কেউ দাবি করেন, চোখের গঠন ও চাহনিতে নাকি সত্যিই নেতানিয়াহুর সঙ্গে কিছুটা মিল পাওয়া যায়। যদিও বিষয়টি পুরোপুরি কৌতুক ও তুলনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মহিষটির ওজন প্রায় ৭৫০ থেকে ৭৬০ কেজির বেশি বলে জানিয়েছেন খামার কর্তৃপক্ষ। বড় আকৃতির হওয়ায় দূর থেকেই আলাদা করে নজরে পড়ে।
খামারের এক কর্মচারী বলেন, খুব শক্তিশালী মহিষ। রশি ধরে রাখতেও কষ্ট হয়। একটু উত্তেজিত হলে সামলানো মুশকিল।
খামারে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা। কেউ কেউ হাসতে হাসতে বলছেন, নামের সঙ্গে স্বভাবও মিলে গেছে।
দাসেরগাঁও এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে মহিষটি দেখতে আসা মাহফুজ নামের এক দর্শনার্থী বলেন, ফেসবুকে ভিডিও দেখছিলাম। পরে বাচ্চাদের নিয়ে দেখতে এলাম। কাছে গিয়ে দেখি সত্যিই অনেক রাগী। লোকজন দেখলেই চোখ বড় বড় করে তাকায়।
আরেক দর্শনার্থী কলেজশিক্ষার্থী রাকিব বলেন, মানুষ নাম শুনেই আগ্রহ পাচ্ছে। এখন সবাই ছবি তুলছে, ভিডিও করছে। এক ধরনের বিনোদনও হয়ে গেছে।
খামার কর্তৃপক্ষ জানায়, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মহিষটিকে বিশেষ যত্নে পালন করা হচ্ছে। নিয়মিত ঘাস, খড়, ভুসি, ভুট্টা ও পুষ্টিকর খাদ্য দেওয়া হয়। শরীর ঠিক রাখতে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদানও খাওয়ানো হয়।
প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে গোসল করানো হয় মহিষটিকে। গরমে যাতে অস্বস্তি না হয়, সেজন্য খামারের ছাউনিতেও রাখা হয়েছে বাড়তি ব্যবস্থা।
এক কর্মচারী বলেন, এত বড় প্রাণী সুস্থ রাখতে অনেক যত্ন লাগে। খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা—সবকিছু নিয়ম মেনে করতে হয়।
তবে পরিচর্যার সময় সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হয় তার আচরণের কারণে। কর্মচারীরা জানান, মাঝে মাঝে সে আচমকা মাথা নাড়িয়ে সামনে থাকা মানুষকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে।
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যালবিনো প্রাণীর শরীরে মেলানিনের পরিমাণ কম থাকে। ফলে তাদের গায়ের রং সাধারণ প্রাণীর তুলনায় অনেক হালকা বা সাদা দেখায়। চোখেও আলাদা আভা দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশে অ্যালবিনো গরু বা মহিষ খুব বেশি দেখা যায় না। ফলে এমন প্রাণী সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ম্যানেজার মেহেদী হাসান বলেন, কোরবানির ঈদের আগে ভালো দাম পেলে বিক্রি করা হবে। অনেকে এসে দাম জিজ্ঞেস করছে। তবে আমরা চাই, যিনি কিনবেন তিনি যেন ঠিকভাবে যত্ন নিতে পারেন।
তিনি বলেন, মানুষ এখন শুধু কোরবানির পশু হিসেবেই দেখছে না, এক ধরনের আকর্ষণ হিসেবেও দেখছে।
এর মধ্যেই আবার মাথা ঝাঁকিয়ে ওঠে মহিষটি। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন দ্রুত সরে গেলেন। খামারের এক কর্মচারী দূর থেকে বললেন, দেখছেন তো, নামটা এমনি এমনি রাখি নাই!