যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সরু গলিতে যখন শহর এখনো ঘুমিয়ে, ঠিক তখনই ভোরের আলোয় শুরু হয় এক নারীর তীব্র সংগ্রাম। তিনি রোজিনা বেগম—অভাব আর অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার অদম্য এক যোদ্ধা। স্বামীর মৃত্যুর পর ভেঙে পড়ার সুযোগ পাননি তিনি; জীবন তাকে শিখিয়েছে লড়াই করতে। তাই বেঁচে থাকার তাগিদে বেছে নিয়েছেন শহরের বর্জ্য সংগ্রহের কঠিন পথ।
ফতুল্লা বাজার এলাকায় গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহের শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন রোজিনা। সমাজের চোখে এই কাজ হয়তো অবহেলিত, কিন্তু রোজিনার কাছে এটি জীবনধারণের একমাত্র অবলম্বন। প্রতিদিন সকালে একটি পুরোনো ভ্যান, হাতে বালতি আর কাঁটা নিয়েই শুরু হয় যাত্রা। প্রায় ৩০০টি বাসার দরজায় কড়া নেড়ে বাড়ির আবর্জনা সংগ্রহ করেন তিনি।
সংগ্রহের পর শুরু হয় আরো কঠিন কাজ। ভ্যান চালিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে যেতে হয় ডাম্পিং পয়েন্টে। ভ্যান নিয়ে যেখানে বর্জ্য নামাতে হয় সে পথে ছড়িয়ে থাকে ভাঙা কাঁচ, ধারালো লোহা এবং বিষাক্ত মেডিক্যাল বর্জ্য। প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, প্রতিটি নিঃশ্বাসে অসুস্থতার ভয়।
কিন্তু শরীরের এই ক্ষত আর ঝুঁকির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় সন্তানদের মুখে একমুঠো খাবারের চিন্তা। তাই ভয়কে জয় করেই এগিয়ে চলেছেন তিনি।
দিনশেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন রোজিনা ঘরে ফেরেন, সন্তানদের হাসিমুখ দেখলে তার সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। জীবনের এই কঠিন বাস্তবতার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রোজিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার দুটি সন্তান।
আমার মেয়েটি মাদ্রাসায় পড়ে, ওর পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। আমার অন্য সন্তানটি ২৮ পারা কোরআনের হাফেজ হয়েছে, যা একজন মায়ের জন্য গর্বের। কিন্তু অভাবের তাড়নায়, পড়াশোনার খরচ আর জোগাড় করতে না পেরে সে এখন আমার সঙ্গে কাজ করে। একজন হাফেজের হাতে এখন ময়লার বালতি দিচ্ছি আমি, এতে আমার বুকটা ফেটে যায়, কিন্তু পেটের ক্ষুধা আর সংসারের দায় আমাকে আর আমার সন্তানকে এই পথে হাঁটতে বাধ্য করছে।’
প্রান্তিক পর্যায়ের এই সাহসী নারীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের কথা জানান, নারায়ণগঞ্জ জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক ভিকারুননেছা। তিনি বলেন, ‘সরকার শ্রমিকদের উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে রোজিনাদের মতো প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
নারায়ণগঞ্জ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) -এর সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, ‘রোজিনা আমাদের সমাজের হাজারো অদেখা শ্রমজীবী মানুষের প্রতিচ্ছবি। যাদের ঘামে গড়ে ওঠে শহরের পরিচ্ছন্নতা, যাদের ত্যাগে সমাজ সামনের দিকে এগিয়ে চলে, অথচ দিনশেষে তারা রয়ে যান অগোচরে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শ্রমিকের মর্যাদা কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শ্রমিক দিবসে রোজিনাদের মতো সংগ্রামী মানুষদের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই অঙ্গীকার। কারণ, বর্জ্যের স্তূপের মাঝেও তারা স্বপ্নের বীজ বোনেন।’
সম্পাদক : রনি কুমার দাস, প্রকাশক : মোঃ আল আমিন মিয়া রকি কর্তৃক প্রকাশিত
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : পশ্চিম ভোলাইল মেলিটিরী বাড়ি কাশীপুর ফতুল্লা নারায়ণগঞ্জ।
যোগাযোগ : ০১৫১১-৭০৫৩৮৪, ০১৯১৬-১৮৭২৫৪.
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত