যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের ঝুট ব্যবসা এখন তিন মাফিয়ার নিয়ন্ত্রণে! ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর গেল ২০ মাসে এই তিন মাফিয়া কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। আদমজী ইপিজেডের ঝুটের ব্যবসা আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি ইন্টারপুলের রেড ওয়ারেন্টভুক্ত সন্ত্রাসী মতিউর রহমান মতির নিয়ন্ত্রনে থাকলেও ক্ষমতার পালাবাদালে এই তিন মাফিয়ার নিয়ন্ত্রনে চলে আসে আদমজী ইপিজেটের ঝুঁট সেক্টর। যার মধ্যে একজন আওয়ামীলীগ সরকার আমলে মতির ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন, সেই তিনি শাহআলম মানিক এখন নিজেকে বিএনপি নেতা পরিচয় দিয়ে আসছেন বলেও উঠেছে অভিযোগ।
স্থানীয়রা জানান, ১২ ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝে সুষম বন্টন করে দিবেন ইপিজেডের ঝুটসহ বিভিন্ন ব্যবসা। কিন্তু এমপি মান্নানের এই উদ্যোগকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়েছেন ঝুট মাফিয়া মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব সাহেদ আহমেদ, মহানগর ছাত্রদলের বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি রাকিবুর রহমান সাগর ও তথাকথিত বিএনপি নেতা শাহআলম মানিক। তারা এমপি মান্নানের এই উদ্যোগকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে উল্টো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেমেছেন। গেল ২০ মাসে এই তিন ব্যক্তি শত কোটি টাকার মালিক বনে গেলেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া।
আরো জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর আরো কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিএনপির সাবেক নেতা গিয়াসউদ্দীনের ছেলেরা নিয়ন্ত্রণে নেন। জাতীয় নির্বাচনের পর ওইসব ব্যবসাগুলো তারা ছেড়ে চলে যান। ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলোও সাহেদ, মানিক ও সাগর দখলে নিয়েছেন। তিনজনই কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের এমপি নজরুল ইসলাম আজাদের নাম ভাঙ্গিয়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা তিনজনই বলে বেড়াচ্ছেন প্রতি মাসে আজাদকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। যে কারনে তারা এমপি মান্নানকে পাত্তা দিচ্ছেন না।
ঝুুট ব্যবসায়ী সাহেদ ইপিজেডে ঘোষণা দিয়েই বলেছেন, তার পাশে এমপি আজাদ, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহামুদ, নাসিকের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না রয়েছেন। সাহেদ এমপি মান্নানকে নিয়ে নানা ধরণের অশালীন কথাবার্তা বলে বেড়াচ্ছেন। একইভাবে শাহআলম মানিক মামুন মাহামুদ ও যুবলীগের সন্ত্রাসী মতির নাম ভাঙ্গিয়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। মতির সকল ব্যবসা এখন শাহআলম মানিকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সাগর দাবি করছেন তার পাশে এমপি আজাদ, মামুন মাহামুদ রয়েছেন। সুতরাং আর কাউকে গোনায় ধরছেন না। যদিও সাগর এলাকায় বলে বেড়াচ্ছেন তিনি এমপি মান্নানের পুত্র সজীবকে মাসে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দিচ্ছেন। বিনিময়ে তিনি ১৭টি ফ্যাক্টরীর ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা তিনজনই বিএনপির নেতাকর্মীদের ব্যবসা করার সুযোগ দিতে নারাজ। প্রতি মাসে এই তিন মাফিয়া আদমজী ইপিজেডের ৪১টি ফ্যাক্টরীর ঝুট ব্যবসা থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন। এই সেক্টর নিয়ন্ত্রণে তাদের পকেটে মাসে ১০ কোটি টাকার লভ্যাংশ ডকুলেও বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীরা রয়েছেন অভুক্ত।
স্থানীয়দের সূত্রে জানাগেছে, আদমজী ইপিজেডের ভেতরে প্রায় ৪১টি শিল্প কারখানা রয়েছে। এসব শিল্পকারখানার ঝুট ব্যবসায় বর্তমানে নিয়ন্ত্রন করছেন জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য কিন্তু দাবিমতে ভুয়া আইন বিষয়ক সম্পাদক শাহআলম মানিক ও মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাকিবুর রহমান সাগর, মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব সাহেদ আহমেদ। এদের মধ্যে ১৭টি সাগর, ১৫টি সাহেদ, শাহআলম মানিক ৯টি ও রুহুল আমিন ৫টি মিল কারখানার ঝুট নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর মধ্যে সাহেদ ও সাগরের সঙ্গে ব্যবসায়িক অশীংকার আয়েশা আক্তার দিনা ও মমিনুর রহমান বাবু। এসব কারখানার ঝুটের ব্যবসায় মাসে তারা ১০ কোটি টাকার বেশি রোজগার করছেন।
আরো জানাগেছে যে, ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ১৬ আগস্ট ইপিজেডের ঝুট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরুতেই জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দীনের ছেলে কাউসার রিফাতের সঙ্গে বিরোধে জড়ান সাহেদ আহমেদ। রিফাতের নিয়ন্ত্রণে নেয়া কারখানার ১৩টি ট্রাক লুটের অভিযোগ ওঠেছিলো সাহেদের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে গিয়াস পন্থীদের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হলে সাহেদ ও সাগরের পক্ষ নিয়ে গণমাধ্যমে ভিডিও বার্তা দিয়ে দিনা ও বাবু জানান তারাও ঝুটের ব্যবসায়িক অশীংদার। তারা বৈধভাবে ব্যবসা করছেন। যদিও সেই সময় থেকে দিনা ও বাবু ঝুটের একটি লাভের অংশ সাহেদ ও সাগরের কাছ থেকে পেয়ে আসছে। রিফাতের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে রিফাতের পক্ষে কৃষকদল নেতা তৈয়ম হোসেন বাদী হয়ে ৯ অক্টোবর দিনা সাহেদ ও বাবুকে আসামী করে কোর্টে মামলা করে দিয়েছেন।
৫ আগস্টের পর ২০২৫ সালের ৬ মার্চ রাকিবুর রহমান সাগর সিদ্ধিরগঞ্জে ঝুট সেক্টর দখলবাজি নিয়ে শাহআলম মানিক ও রুহুল আমিনের গ্রুপের সঙ্গে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটিয়েছে। এ ছাড়াও পরবর্তীতে একাধিকবার বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা শামীম ঢালীর সঙ্গেও একাধিকবার গোলাগুলির ঘটনা ঘটিয়েছে সাগর। সিদ্ধিরগঞ্জের ফুটপাত ও ঝুট নিয়ন্ত্রকদের আরেকজন মাফিয়া এই সাগর। প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণকারী সাগরের কর্মী সোহাগকে অস্ত্রসহ ইতিমধ্যে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
এদিকে ১২ই ফেব্রুয়ারী জাতীয় নির্বাচনের পর গিয়াসের ছেলে রিফাতের নিয়ন্ত্রণে থাকা সকল শিল্পকারখানার ঝুট নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে দাঁড়ান। এই সুযোগে রিফাতের নিয়ন্ত্রিত কারখানার ঝুট সাহেদ, সাগর, শাহআলম মানিক, রুহুল আমিন নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহামুদের ঘনিষ্ঠ কর্মী রুহুল আমিন। সিদ্ধিরগঞ্জে বিএনপির কার্যালয়টি মুলত রুহুল আমিনের অর্থে নির্মাণ করা হয়েছে। বিএনপির কার্যালয় নাম দিলেও সেখানে রুহুল আমিনের তেল চুরির ব্যবসা ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে এই কার্যালয়টি করিয়েছেন মামুন মাহামুদ। দিন রাত ২৪ ঘন্টা এখানে রুহুল আমিন ও তার সন্ত্রাসীদের আস্তানায় পরিনত হয়েছে এটি।
সম্পাদক : রনি কুমার দাস, প্রকাশক : মোঃ আল আমিন মিয়া রকি কর্তৃক প্রকাশিত
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : পশ্চিম ভোলাইল মেলিটিরী বাড়ি কাশীপুর ফতুল্লা নারায়ণগঞ্জ।
যোগাযোগ : ০১৫১১-৭০৫৩৮৪, ০১৯১৬-১৮৭২৫৪.
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত