যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জে নিজেকে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত করে তোলা ফেরদাউসুর রহমান-কে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় জেলায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
আলেম-ওলামাদের গ্রেপ্তার করানো, র্যাবের বিতর্কিত কর্মকর্তার সোর্স হিসেবে কাজ করা, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ—এসব অভিযোগে এখন তিনি ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
সম্প্রতি তার ঘনিষ্ঠজন হারুনুর রশিদ প্রকাশ্যে একাধিক বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরলে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়। হারুন দাবি করেন, দীর্ঘ ২০ বছরের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সংগঠন ও নৈতিকতার স্বার্থে এতদিন নীরব থাকলেও এখন সত্য প্রকাশ ছাড়া উপায় নেই।
স্বর্ণ কেলেঙ্কারি ও প্রতারণার অভিযোগ
ফেরদাউসুর রহমানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো প্রায় ৬০ ভরি স্বর্ণ আত্মসাতের ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, সৌদি প্রবাসী শহীদুল ইসলাম-এর সঙ্গে স্বর্ণ দেশে আনার চুক্তি করে পরে তা কাস্টমস জব্দ করেছে বলে মিথ্যা তথ্য দেন তিনি।
এ ঘটনায় একাধিকবার সালিশ হলেও ফেরদাউসুর একই দাবি করে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, এই ঘটনার ধাক্কায় শহীদুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে ভয়ে দেশে আসা বন্ধ করে দেন।
ঘটনার পরপরই ফেরদাউসুরের হঠাৎ সম্পদের উত্থান—বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, একাধিক গাড়ি ক্রয়—নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।
রাজনৈতিক দালালি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেন ফেরদাউসুর।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণে চাপ প্রয়োগ, প্রভাব খাটানো এবং ক্যাডার বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে আর্থিক সুবিধা আদায় করতেন এবং নিজের স্বার্থে দলীয় অবস্থান পরিবর্তন করতেন।
আলেম গ্রেপ্তার ও র্যাব সংযোগ
হারুনুর রশিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেরদাউসুর রহমান র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা আলেপউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তার সোর্স হিসেবে কাজ করতেন।
তিনি দাবি করেন, ২০২১ সালে মনির হোসাইন কাসেমী-সহ শতাধিক আলেমের গ্রেপ্তারের পেছনে ফেরদাউসুরের সরাসরি ভূমিকা ছিল।
সংগঠনে অনাস্থা ও তদন্ত কমিটি
১৮ এপ্রিল জমিয়তের কেন্দ্রীয় আমেলা সভায় ফেরদাউসুর রহমানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগরের প্রায় ৭০ জন নেতা এ প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের নথি ও প্রমাণ সভায় উপস্থাপন করা হয়।
পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেবে।
সাংগঠনিক বিভক্তি ও উত্তেজনা
ফেরদাউসুর রহমান ও তার ঘনিষ্ঠদের কর্মকাণ্ডে স্থানীয় আলেম সমাজে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
সংগঠনটি এখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, অর্থ লেনদেন এবং গোপন বৈঠককে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, পরিস্থিতি যে কোনো সময় সহিংস রূপ নিতে পারে।
কোণঠাসা অবস্থায় ফেরদাউসুর
বর্তমানে ফতুল্লা এলাকায় অবস্থান হারিয়ে আড়াইহাজার ও সোনারগাঁ এলাকায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন ফেরদাউসুর রহমান। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে তার গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত কমে যাচ্ছে। বিরোধী পক্ষের চাপ, সংগঠনের অনাস্থা এবং একের পর এক অভিযোগে তিনি এখন কার্যত কোণঠাসা।
উপসংহার :
একসময় ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে পরিচিত ফেরদাউসুর রহমান এখন অভিযোগ, বিতর্ক ও অনাস্থার জালে আটকে পড়েছেন।
তদন্তের ফলাফল ও পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান।
সম্পাদক : রনি কুমার দাস, প্রকাশক : মোঃ আল আমিন মিয়া রকি কর্তৃক প্রকাশিত
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : পশ্চিম ভোলাইল মেলিটিরী বাড়ি কাশীপুর ফতুল্লা নারায়ণগঞ্জ।
যোগাযোগ : ০১৫১১-৭০৫৩৮৪, ০১৯১৬-১৮৭২৫৪.
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত