যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ও বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম মন্ডল অবশেষে আইনের জালে ধরা পড়েছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুরে মন্ডলপাড়া এলাকায় নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এমদাদুল হক জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আইনে অন্তত ৯টি মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাকে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
ক্ষমতার ছায়ায় উত্থান
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন সিরাজ মন্ডল।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে এই ঘনিষ্ঠতাকে পুঁজি করে এলাকায় নিজের প্রভাব বলয় গড়ে তোলেন তিনি।
গত প্রায় ১৭ বছরে সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় তার আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি প্রশাসনিক প্রভাবও কাজে লাগিয়ে তিনি স্থানীয়ভাবে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তেলচুরির অভিযোগ ও ‘ক্যাশিয়ার’ পরিচিতি
সিরাজ মন্ডলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হচ্ছে চোরাই তেলের অবৈধ ব্যবসা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে তেলচুরির একটি সিন্ডিকেট পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং এ ক্ষেত্রে শামীম ওসমানের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করতেন।
অভিযোগ রয়েছে, তার নিজ বাসার নিচতলাতেই গড়ে তোলা হয়েছিল তেলের গুদাম, যেখান থেকে অবৈধভাবে তেল মজুদ ও সরবরাহ করা হতো। এই কার্যক্রম ছিল বিদ্যমান নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
সম্পদের বিস্তার ও প্রশ্ন
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাবেক কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ও পরবর্তী সময়ে সিরাজ মন্ডল বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন।
মন্ডলপাড়া এলাকায় তার একাধিক বাড়ি, স্থাপনা ও বাণিজ্যিক সম্পদ রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এছাড়া তার মালিকানায় একাধিক ফিলিং স্টেশন থাকার কথাও শোনা যাচ্ছে।
তবে এসব সম্পদের উৎস নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। আয় ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
হত্যা মামলাসহ একাধিক অভিযোগ
সিরাজ মন্ডলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবুও স্থানীয়দের মধ্যে তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের নেতিবাচক ধারণা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান।
একাধিক মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও এতদিন তার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল।
দুদকের তদন্ত দাবি
স্থানীয়দের একটি বড় অংশ মনে করছেন, সিরাজ মন্ডলের সম্পদের উৎস ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি।
বিশেষ করে তেলচুরি, সম্পদ অর্জন ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে বলে তারা মনে করেন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
সিরাজ মন্ডলের গ্রেপ্তারকে অনেকেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখছেন।
দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা এই নেতার গ্রেপ্তার স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
উপসংহার
সিরাজুল ইসলাম মন্ডলের গ্রেপ্তার শুধু একটি ব্যক্তিগত আইনি ঘটনা নয়; এটি স্থানীয় রাজনীতি, ক্ষমতার ব্যবহার, এবং অভিযোগিত দুর্নীতির একটি বড় চিত্রের অংশ।
এখন দেখার বিষয়—তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কতটা প্রমাণিত হয় এবং তদন্ত কতদূর এগোয়। একই সঙ্গে এই ঘটনা ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগের বিরুদ্ধে কতটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্পাদক : রনি কুমার দাস, প্রকাশক : মোঃ আল আমিন মিয়া রকি কর্তৃক প্রকাশিত
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : পশ্চিম ভোলাইল মেলিটিরী বাড়ি কাশীপুর ফতুল্লা নারায়ণগঞ্জ।
যোগাযোগ : ০১৫১১-৭০৫৩৮৪, ০১৯১৬-১৮৭২৫৪.
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত