
যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নির্বাচনের দামামা বাজছে প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে। নগরীর প্রতিটি অলিগলিতে এখন নির্বাচনী উত্তেজনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মাঠ পর্যায়ের সমীকরণ বলছে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এবার ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট। প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার ভোটার আসন্ন নির্বাচনে যেকোনো প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণে বা ভাগ্য রুদ্ধ করতে সক্ষম।
নির্বাচনী এই বিশাল জনপদে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এই অংশীদারের সমর্থন ছাড়া কোনো আসনেই জয় নিশ্চিত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ জেলার মোট জনসংখ্যা ৩৯ লাখ ৯ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় এক লাখ ৮৮ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮২ শতাংশ। এ ছাড়া জেলায় ৯৬৩ জন খ্রিস্টান এবং ৫৫০ জন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নাগরিক রয়েছে।
জেলা নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য মতে, জেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। জনসংখ্যার আনুপাতিক হার (৪.৮২%) বিবেচনায় নিলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটার প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার ৬৮০ জন। অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটার খুব বেশি না হলেও জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যেই হিন্দু ভোটাররা প্রতিটি আসনেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংখ্যার বিচারে একক কোনো আসনে এই ভোট খুব বেশি মনে না হলেও যখন এই ভোটব্যাংক একত্র হয়, তখন তা জয়-পরাজয়ে বড় প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, যে আসনগুলোতে প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, সেখানে হিন্দু ভোটাররা প্রার্থীদের জয়ের ব্যবধান ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিতে পারেন। নারায়ণগঞ্জের প্রায় প্রতিটি আসনেই এবার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের সম্ভাবনা থাকায় এই ভোটগুলোই হয়ে উঠছে ‘তুরুপের তাস।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে সক্রিয় না থাকায় এই বিশাল ভোটব্যাংক নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই এখন চাচ্ছে হিন্দু ভোটারদের নিজেদের শিবিরে ভিড়িয়ে জয়ের পথ সুগম করতে।
প্রার্থীরা হিন্দু সম্প্রদায়ের মন জয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই বিএনপি এবং অন্যান্য দলের নেতারা বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপ পরিদর্শন করে মতবিনিময় করেছেন। পূজা ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে তাঁদের সরব উপস্থিতি এবং উপহার-উপঢৌকন বিতরণের মাধ্যমে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপি জোটের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় গণসংযোগকালে হিন্দু এলাকাগুলোতে যখন তাঁদের কাছে যাই, তাঁরা আনন্দে আপ্লুত হয়ে আমাকে গ্রহণ করেছেন। নির্বাচনের দিন তাঁরা সবাই আমাকেই ভোট দেবেন বলে আমি আশা করছি।’
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী ও খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব এ বি এম সিরাজুল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে সুযোগ-সুবিধায় হিন্দু-মুসলমান হিসেবে কারো মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। আমার এই আসনে নিতাইগঞ্জ এলাকা বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি বসবাস করে। আমরা তাঁদের কাছে গিয়েছি, কথা বলেছি। আগামীর বাংলাদেশে তাঁরা আমাদের কাছেই নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন।’
নারায়ণগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার শিপন বলেন, ‘৫ আগস্টের পর প্রতিটি রাজনৈতিক দল আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে একটি মার্কায় ভোট দেওয়া যায়। আমাদের জোটগতভাবে কোনো নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর পছন্দের মার্কায় ভোট দেবেন। এ ক্ষেত্রে সৎ এবং যোগ্য লোককেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটাররা বেছে নেবেন।’