যুগের নারায়ণগঞ্জ:
নারায়ণগঞ্জ জেলার সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে ফতুল্লা অঞ্চল ও সদরের দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। এ আসনে বিএনপি জোটের মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি একাধিক প্রভাবশালী বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র কিংবা ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যানারে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামায় ভোটের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই লড়াইয়ে কে এগিয়ে থাকবেন তা অনেকটাই নির্ভর করছে ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকায় প্রভাব বিস্তারকারী কয়েকজন নেতার অবস্থান ও ভূমিকার ওপর। ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক, দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি ও এলাকাবাসীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে তারা হতে পারেন এবারের নির্বাচনে ‘গেম চেঞ্জার’।
দলীয় পরিচয়ের বাইরে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা এসব নেতা শুধু কর্মীবান্ধব নন, বরং এলাকাবাসীর সুখ-দুঃখে পাশে থেকে নিজেদের আলাদা "ভোট ব্যাংক" গড়ে তুলেছেন। তরুণ ভোটারদের মধ্যেও তাদের জনপ্রিয়তা রয়েছে, যা এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রভাব ধরে রাখা নেতাদের তালিকায় রয়েছেন: জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক জাহিদ হাসান রোজেল, ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টু, মহানগর বিএনপির সাবেক সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক মনির হোসেন সরদার, ফতুল্লা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী এবং জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি।
এই তালিকার মধ্যে মাশুকুল ইসলাম রাজীব ও মশিউর রহমান রনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। মনোনয়ন না পেলেও তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভিত্তি ও স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা তাদের নিজ নিজ এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকে ধরে রেখেছে। ফলে ভোটের মাঠে তারা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবেন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে এ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও ছিলেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবারও আসনটিতে বিএনপি সরাসরি দলীয় প্রার্থী দেয়নি। জোটগত সিদ্ধান্তে এবারও আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর জন্য।
তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এবং বিএনপি নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম। এছাড়া বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির ব্যানারে প্রার্থী হয়েছেন। ফলে এ আসনে মূল লড়াই দাঁড়িয়েছে ‘বিএনপি বনাম বিএনপি’ সমীকরণে।
এমন পরিস্থিতিতে ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকার কয়েকজন তরুণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিকের অবস্থানই হয়ে উঠেছে নির্বাচনের প্রধান নিয়ামক। পর্যবেক্ষকদের মতে, তাদের সমর্থনের পাল্লা যেদিকে ভারী হবে, তার জন্য নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়া সহজ হয়ে যাবে।
এই তালিকায় প্রথমেই আসে মাশুকুল ইসলাম রাজীবের নাম। জেলা বিএনপির এ জ্যেষ্ঠ নেতা ছাত্রদল হয়ে তৃণমূল থেকে উঠে এসেছেন। তিনি সরকারি তোলারাম কলেজের সাবেক ভিপি ছিলেন এবং রাজনীতির মাঠে তার শক্তিশালী অনুসারী কর্মীবাহিনী রয়েছে। মনোনয়ন না পেলেও এলাকায় রয়েছে তার বিশাল প্রভাব। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ইতিবাচক ধারার রাজনীতি করে এলাকায় গড়ে তুলেছেন একটি ক্লিন ইমেজ। ফলে ভোটের মাঠে তার অবস্থান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
জাহিদ হাসান রোজেলও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক। দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে সক্রিয় এই নেতা এনায়েতনগর, কাশীপুর ও বক্তাবলি ইউনিয়নে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন। তার নেতৃত্বাধীন কর্মীবাহিনী ভোটের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ফতুল্লা অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে আলোচিত নাম মনিরুল আলম সেন্টু। বিতর্ক থাকলেও কুতুবপুর ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান হিসেবে তার জনপ্রিয়তা স্পষ্ট। তিনি গত নির্বাচনে শামীম ওসমানের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়ে দল থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়ে কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন। একাধিক ইউপি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ইউনিয়নে তিনি প্রায় অপ্রতিরোধ্য। বৃহৎ ভোটারসংখ্যার কারণে কুতুবপুরের হিসাবেই বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছেন সেন্টু।
রাজনীতির মাঠের চেয়ে সমাজসেবায় অবদান রেখে বেশি আলোচিত ফতুল্লা ইউনিয়নের মনির হোসেন সরদার। মহানগর বিএনপির এ নেতা তল্লা এলাকায় বেড়ে উঠেছেন। বৃহত্তর তল্লাবাসীর কাছে মনির হোসেন সরদার অতি-পরিচিত একটি নাম। দেশের স্বনামধন্য পোশাক-শিল্প প্রতিষ্ঠান মডেল ডি ক্যাপিটালের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা মনির হোসেন সরদার বিগত সময়ে বিএনপির নেতা কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের পাশে থেকে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। ফলে ফতুল্লা ইউনিয়নের ভোটারদের বড় একটি অংশের কাছে বেশ প্রভাব রয়েছে তার। আলীরটেক ও গোগনগরে ইউনিয়নের ভোটারদের মধ্যেও রয়েছে তার গভীর যোগাযোগ।
ফতুল্লা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী সাম্প্রতিক বিতর্ক কাটিয়ে আবারও সক্রিয় হয়েছেন। তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হয়েছে এবং নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক হিসেবে ব্যবসায়ী মহলেও তার প্রভাব রয়েছে। কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে এলাকায় তার আলাদা অবস্থান এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি ফতুল্লায় বিএনপির রাজনীতিতে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তার জনপ্রিয়তাও প্রবল এবং ফতুল্লায় রয়েছে তার নিজস্ব ভোট ব্যাংক।
তরুণ ভোটারদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি। ছাত্রদলের সাবেক এই নেতা গুম ও দীর্ঘ কারাবাসের অভিজ্ঞতার কারণে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন পরিচিতি পেয়েছেন। শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় দলীয় হাইকমাণ্ড ও তরুণদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় থাকায় এলাকায় তার নিজস্ব কর্মীবাহিনী রয়েছে।
সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এবারের নির্বাচন দল বা প্রতীকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং নির্ভর করছে এসব প্রভাবশালী নেতার অবস্থান, সক্রিয়তা ও সমর্থনের ওপর। শেষ পর্যন্ত তারা কার পক্ষে মাঠে নামেন, সেটিই নির্ধারণ করে দেবে ভোটের দৌড়ে কে এগিয়ে থাকবেন। ফলে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ফতুল্লার এই ‘গেম চেঞ্জার’ নেতাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ ভোটাররা।
সম্পাদক : রনি কুমার দাস, প্রকাশক : মোঃ আল আমিন মিয়া রকি কর্তৃক প্রকাশিত
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : পশ্চিম ভোলাইল মেলিটিরী বাড়ি কাশীপুর ফতুল্লা নারায়ণগঞ্জ।
যোগাযোগ : ০১৫১১-৭০৫৩৮৪, ০১৯১৬-১৮৭২৫৪.
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত